স্টাফ রিপোর্টার : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার প্রতিটি এলাকায় দেখা দিয়েছে গরুর লাম্পিস্কিন (এলএসডি) রোগ। ভাইরাসজনিত এই রোগে আক্রান্তের মধ্যে বাছুরের সংখ্যাই বেশি। ভাইরাস জনিত এই রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়ায় গোবাদি পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উপজেলার প্রান্তিক খামারিসহ কৃষকেরা। এদিকে লাম্পিস্কিন রোগের ভ্যাকসিন সহজলভ্য না হওয়ায় প্রতিনিয়ত সর্বশান্ত হচ্ছেন হত দরিদ্র গোবাদি পশু পালনকারীরা।
গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাণিসম্পদ সূত্রে জানা যায়, গোয়ালন্দ পৌরসভাসহ উপজেলার চারটি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই লাম্পিস্কিন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। রোগটি ছোঁয়াচে ও মশা-মাছি বাহিত হওয়ায় আক্রান্ত এক গরু থেকে অন্য গরুর দেহে সহজে ছড়িয়ে পড়ছে এলএসডি। প্রতিষেধক হিসেবে লাম্পিস্কিন সংক্রামন রোধের জন্য সরকারি কোন ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। বেসরকারী ভাবে সরবরাহকৃত ভ্যাকসিন বাজারে পাওয়া গেলেও তার দাম আকশ ছোঁয়া। আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায় এই রোগের এক প্যাকেজ ভ্যাকসিন বাজারে বিক্রি হয়। এক প্যাকেজে ১০টি গরুকে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি গরুর জন্য আলাদা আলাদা কোন ভ্যাকসিন সংগ্রহ করার উপায় নেই। এদিকে এলাকায় সাধারনত কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অন্যান্য শ্রমজীবি মানুষ মূল পেশার সাথে সাথে দু’একটি করে গরু পালন করে থাকে। আর তাদের পক্ষে এত দামী ভ্যাকসিন কিনে গরুকে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। স্বাভাবিক ভাবে অতিরিক্ত খচর হয়ে যাওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও বেশীর ভাগ পশুপালনকারীরা এই ভ্যাকসিন দিতে পারেন না। এতেকরে চমর ক্ষতির মুখে পড়েন প্রান্তিক এ সকল পশু পালনকারীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পশু চিকিৎসক জানান, লাম্পিস্কিন রোগ সংক্রমন রোধে এখনো পশু স্বাস্থ্য বিভাগ কোন প্রকার ভ্যাকসিন সরবরাহ না করলেও অতীতে গরুর মাংকি পক্স (গুটি বসন্ত) রোগের জন্য ভ্যাকসিন দেয়া হতো। পশুকে ওই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা থাকলে লাম্পিস্কিন রোগ অপেক্ষাকৃত কম সংক্রমিত হয়। তবে সেই ভ্যাকসিন প্রয়োগও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
গত সোমবার (৭ জুলাই) গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে কথা হয় হতদরিদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফার সাথে। তিনি বলেন, ‘অনেক আশা করে দেড় লাখ টাকা খরচ করে একটি গোয়ালঘর তৈরী করে একটি বকনা বাছুর কিনেছিলাম। বিগত ৮ মাস পরম যতেœ লালন-পালন করেছিলাম। ইতিমধ্যে গরুটির ডাক এসে গর্ভবতীও হয়েছিল। এরমধ্যেই গরুটি লাম্পিস্কিন রোগে আক্রান্ত হয়। দ্রুত চিকিৎসক এনে চিকিৎসাও করিয়েছিলাম। কিন্তু তার ভাগ্য খারাপ, ১২/১৩ হাজার টাকা খরচ করেও গরুটি বাঁচাতে পারিনি। আমি গরীব মানুষ। আর টাকাও যোগার করতে পারিনি, গরুও কিনতে পারিনি। এখন আমার শুন্য গোয়ালটি পড়ে আছে।’
একই এলাকার দরিদ্র কৃষক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘লাম্পিস্কিন রোগে আমার মাত্র ৩ মাস বয়সী বকনা বাছুরটি গত ৬ জুন মারা গেছে। আমার যে গাভীটির ১০/১২ লিটার দুধ দিত, বর্তমানে কোন দুধই দিচ্ছে না। বাছুর মারা যাওয়ায় গাভীটি দুধ দহন করতে দেয় না, আবার দুধও শুকিয়ে গেছে। এতে আমি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি।’ এসময় তিনি পশু বিভাগ থেকে গরুর লাম্পিস্কিন রোগের ভ্যাকসিন বিনামূল্যে প্রদানের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘ফ্রী দেয়া যদি সম্ভব নাই হয়, তবে অন্তত প্রতিটি গরুর জন্য যাতে আমরা আলাদা ভাবে ভ্যাকসিনের ড্রোজ কিনতে পারি সেই ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।’
ওই এলাকার গরুর খামারী মো. মোন্তাজ প্রামানিক জানান, তার খামারে মোট ১১টি গরু রয়েছে। এরমধ্যে ৩টি বাছুর গরু লাম্পিস্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসা চলছে, সাথে বাড়ছে খরচ। ভ্যাকসিন কেন দেননি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলম কিছু হবে না, এছাড়া টাকারও একটু টানাটানি ছিল, তাই ভ্যাকসিন দেয়া হয়ে ওঠেনি।’ এ গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে লাম্পিস্কিন রোগ আক্রান্ত গরু-বাছুর।
এ সময় কথা হয় একটি গরুর চিকিৎসা দিতে আসা গরুর পল্লী চিকিৎসক সাহাবউদ্দিন শেখের সাথে। তিনি জানান, এ এলাকার অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ গরু লাম্পিস্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে ৪/৫ গরু মারা গেছে। বাজারে বিভিন্ন কোম্পনীর লাম্পিস্কিন রোগের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা থাকলে গরু এই রোগ থেকে শতভাগ মুক্ত থাকে।
উপজেলার চর মজলিশপুর গ্রামের কৃষক মো. মোবারক খাঁ বলেন, প্রতিদিনের মত রাতের বেলায় ভালো গরু গোয়ালে রেখেছি, সকালে দেখি চামড়ায় গুটি বের হয়ে ফোসকা পড়েছে, পরে জ্বরের কারণে কাঁপুনি ও খাবার খাওয়া ছেড়ে দেওয়ায় দুর্বল হয়ে পরে গরুটি মারা গেল। আমাদের গ্রামে আরো একটি গরু মারা গেছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাণিস্পদ কর্মকর্তা মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘লাম্পিস্কিন নামের ভাইরাসজনিত এই রোগটি ছোঁয়াচে। মশা ও মাছির মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুর দেহে সহজে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। সরকারি ভাবে আমরা এ রোগের ভ্যাকসিন এখনো পাইনি। তবে বেসরকারি ভাবে কিছু কিছু ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ রোগে বড় গরুর চেয়ে ছোট বাছুর বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। রোগটি সম্পর্কে এলাকার কৃষক ও খামারিদের সতর্ক করতে আমরা নিয়মিত উঠান বৈঠক করছি। সেখানে খামার, গোয়ালঘরসহ আশপাশ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মশারি ব্যবহারের পাশাপাশি গরু ও বাছুরকে ভিটামিন যুক্ত পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ানো, নিমপাতার পানি গরম করে সেই পানি দিয়ে গরু-বাছুরকে গোসল করানোসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছি।’
মন্তব্য করুন