শ্রমজীবিদের কষ্টগাঁথা : ‘দিন পনের আগে একবার ছোট ইলিশ কিনছিলাম’ - Rajbari
রাজবাড়ী বিডি ডেস্ক
২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শ্রমজীবিদের কষ্টগাঁথা : ‘দিন পনের আগে একবার ছোট ইলিশ কিনছিলাম’

‘আজ (শনিবার) সহালে ডাইল দিয়া ভাত খাইছি, লগে আলু ভর্তাও ছিল। যা কামাই হয় হেতা দিয়া ভাতই জোটে না, মাছ কিনবো কেবে কইরা। তয় দিন ১৫ আগে জাটকা ইলিশ কিনছিলাম। হেরপর আর মাছ কেনা অয়নাই।’ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন ষাটোর্ধো বয়সী দৌলতদিয়া লঞ্চ ঘাটের কুলি শ্রমিক আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা। তার বাড়ি দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের হোসেন মন্ডলের পাড়া গ্রামে।

কত দিন আগে মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গেল বছর কোরমানীর ঈদের সুমায় গরুর গোস্ত খাইছিলাম, হের পর আর খাওন হয় নাই। তয় কয়েকদিন আগে বাড়িতে কুটুম আইছিল, তহন ছোট এটা ফারামের মুরগী (ব্রয়লার) কিনছিলাম।’

আলাপকালে আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা আরো জানান, এক সময় তাদের বাড়ি ছিল গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের বেথুরী গ্রামে। সামান্য কিছু জায়গা-জমিও ছিল। ২০ বছর আগে বাড়িঘর সহ জমিজমা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। তারপর দৌলতদিয়ায় এসে অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে ঝুপড়ি ঘর করে বসবাস করেন এবং দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটে কুলি শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। তিন ছেলে ও এক মেয়ের বাবা আ. কুদ্দুস মোল্লা। মেয়ে বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেরা রাজ মিস্ত্রির কাজ করেন। ছেলেরা পৃথক হয়ে আলাদা আলাদা সংসার করেন। আ. কুদ্দুস মোল্লার মা ও স্ত্রীর ভরনপোষন করতে হয় তার। আক্ষেপ করে আব্দুল কুদ্দস বলেন, ‘এই জামানার পুলাপান, উরা মা-বাপরে আলাদা কইরা দিছে, তয় আমি তো আর আমার মারে ফ্যালাইতে পারবো না।’

কয়েক বছর আগে আ. কুদ্দুস মোল্লা টং দোকান ঘর স্থানান্তর করার সময় ঘরের নিচে পড়ে আহত হন। এসময় তার মেরুদন্ড ভেঙে যায়। টাকার অভাবে যথাযথ চিকিৎসাও করাতে পারেননি আ. কুদ্দুস মোল্লা। প্রায় এক বছর করিরাজি চিকিৎসা করিয়ে আজীবনের জন্য কুঁজো হয়ে এক মুঠো ভাতের জোগার করতে ফিরে এসেছেন তার আগের পেশায়। কুঁজো অবস্থায়ই তিনি যাত্রীদের বড় বড় বোঝা বহন করে তুলে দিচ্ছেন লঞ্চে। শারীরিক প্রতিবন্ধি আব্দুল কুদ্দুসের ভাগ্যে আজ পর্যন্ত জোটেনি সরকারের কোন প্রকার ভাতা।

কোন প্রকার ভাতা পান নাকি? জিজ্ঞাসা করতেই তিনি উচ্ছোসিত হয়ে পকেট থেকে একটি কাগজ (প্রতিবন্দ্বি সনদ) বের করে জবাব দেন, ‘আগে কুনো দিন পাইনি, তয় এইবার পাব।’ এ ব্যাপারে তিনি প্রচন্ড আশাবাদি, এবার তার প্রতিবন্দ্বি ভাতা চালু হবে।

কাক ডাকা ভোরে আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা যাত্রীদের ব্যাগ-বোঝা লঞ্চে তুলি দিতে চলে আসেন দৌলতদিয়া লঞ্চ ঘাটে। রাত ৯টা পর্যন্ত তিনি লঞ্চ ঘাটেই থাকেন। সারাদিন কোথায় খাওয়া-দাওয়া করেন জানতে চাইলে আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা বলেন, কুনো কুনো দিন বাড়িত্যা আসনের সময় ভাত নিয়্যা আসি, আর না আনলে পাউরুটি-কলা খাইয়া দিন পারকরি।’ আলাপকালে তিনি আরো বলেন, ‘কয়দিন আগেও লঞ্চ ঘাটে কুলির কাম কইর ডেইলি হাজার টাহা কামাইতাম, এহুন ২/৩শ টাহাও অয় না। গাড়ি-গোরা কম, যাত্রীও কম, তাই কামাইও কম।’

গোয়ালন্দ বাজারে বিভিন্ন পণ্যবাহি ট্রাক থেকে মালামাল খালাস করে জীবিকা নির্বাহ করে ৪০ বছর বয়সী মো. উজ্জল শেখ। তার নিজের কোন আবাদি জমি নেই, তাই ট্রাক থেকে মাল খালাস করে যে টাকা আয় হয় তাতেই চলে তার সংসারের চাকা। পরিবার নিয়ে থাকেন গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুন পাড়া এলাকায়। এই কাজ করে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ পাঁচজনের সংসার চালান।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে গোয়ালন্দ খাদ্যগুদামের সামনে ট্রাক থেকে মালামাল খালাসের সময় কথা হয় মো. উজ্জল শেখের সাথে। তিনি জানান, তিনিসহ তারা ১০/১২ মিলে একটি দলে কাজ করেন। কিছুদিন আগেও গোয়ালন্দ বাজারে যে পরিমাণ পণ্যবাহি ট্রাক আসতো তাতে তারা দলের প্রত্যেকেরই ৭শ থেকে ১ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু শুনছি জ¦লানী তেল না পাওয়ায় গত ২/৩ সপ্তাহ ধরে আগত ট্রাকের সংখ্যা কমে গেছে। এতে তারা একেক জনের ৫শ টাকাও আয় হতে চায় না। হঠাৎ আয় কমে তারা প্রত্যেকেরই স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ পতন হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তিন ছেলেমেয়ে, স্ত্রীকে নিয়ে পাঁচজনের সংসার। আমার আয়েই চলে। শ্রমিকের কাজ করে এমনি সময়ে যে টাকা ইনকাম হতো, তাতে মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু এরকম চললে পরিবার-পরিজন নিয়ে ক্যামনে চলবো? এই কাম ছাড়া আর কোন কামও আমার জানা নেই, চাইলেও অন্য কিছু করবার পারব না।’

তিনি আরো বলেন, ‘ম্যায়ডা একটু লেহা-পড়া শিখতেছে। শুক্কুরবার হইলে একটু ভালো কিছু খাওয়ার আবদার করে। অনেক দিন ধরেই প্রেত্যেক শুক্কুরবারে অন্তত পক্ষে একটা বয়লার মুরগী বাজার করি। মাঝে মধ্যে একটু কষ্ট হইলেও গরুর মাংস কিনতাম। গত দুই শুক্কুরবার ছাওলা-ম্যায়ার পাতে একটু বয়লারও দিবার পারতিছি না।’

গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের ৩২ বছর বয়সী রিক্সা চালক মো. জাহিদুল ইসলাম। জীবনের চাকা সচল রাখতে ব্যাটারী চালিত রিক্সাই তার সঙ্গী। কিন্তু ভয়াবহ লোডসেডিংয়ের কবলে পড়ে একদিকে তার রিক্সা চার্জ হচ্ছে না, অপরদিকে প্রচন্ড গরমে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় কাটে তার নির্ঘুম রাত। শরীর জুড়ে রাজ্যের ক্লান্তি তারপরও জীবিকার তাগিদে তপ্ত রোদ তিনি বের হয়েছেন রাস্তায়। একটু পরপর গামছা দিয়ে ঘাম মুচছেন। শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোয়ালন্দ বাসস্ট্যান্ডে আলাপকালে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রিক্সায় চার্জ নাই, গাঁয়ে জোর নাই, হের পরও পেটের দায়ে দুইডা পয়সার আসায় রাস্তায় নামিছি। মনে হইতাছে, আকাশ থেইকা আগুন পড়তেছে। কারেন্ট যা নাগাইছে, আমাগো মনে অয় বাছবার দিবো না। গাড়িতে ঠিকমত চার্জ দিতে পারিনা, গরমে হারারাত ঘুমাইবার পারি না, হারাদিন খালি ঝিম আসে। এর মধ্যেই রিকশা চালাই। না চালাইলে খাব কী? আগে দিনে হাজার/বারোশ টাকার কামাই করতাম। এহন হাজার টাকার কামাই চার-পাঁচশতে ঠেকছে।’

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজবাড়ীতে ট্রাফিক পুলিশকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে দুই ব্যক্তি আটক

রাজবাড়ীতে ৩৫০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

রাজবাড়ীতে হেরোইনসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

রাজবাড়ীতে সাজাপ্রাপ্তসহ ৩  আসামী গ্রেপ্তার

শ্রমজীবিদের কষ্টগাঁথা : ‘দিন পনের আগে একবার ছোট ইলিশ কিনছিলাম’

গোয়ালন্দে সিএসএস এর ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প

গোয়ালন্দে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন

পাংশায় কৃষিপণ্যে বিক্রয়ে ধলতা নেওয়া বন্ধসহ ৮ দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ

বালু অবৈধ উত্তোলন বন্ধে গোয়ালন্দে রাতের আঁধারে প্রশাসনের অভিযান

গোয়ালন্দে হাম-রুবেলায় শিশুর মৃত্যু

১০

গোয়ালন্দে সাংবাদিক শামছুল হকের স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত

১১

নির্ধারিত দামে মিলছে না গ্যাস, রাজবাড়ীতে ক্রেতাদের ক্ষোভ

১২

রাজবাড়ীতে হামের উপসর্গ বাড়ছে, চলছে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম

১৩

পাংশায় মামলা তুলে না নেওয়ায় বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

১৪

বালিয়াকান্দিতে ইয়াবাসহ দুই সহোদর গ্রেপ্তার

১৫

ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, দুর্ভোগে রাজবাড়ীবাসী

১৬

রাজবাড়ী‌তে পে‌ট্রোল পাম্পে কমতে শুরু ক‌রে‌ছে সি‌রিয়াল, বেড়ে‌ছে বরাদ্দ

১৭

গোয়ালন্দে পদ্মায় বালু উত্তোলনের দায়ে ১০ জনের কারাদন্ড

১৮

রাজবাড়ীতে চোরাই ছাগলসহ ৩ জন গ্রেপ্তার

১৯

গোয়ালন্দ প্রতিরোধ যুদ্ধ ও গণহত্যা দিবস পালিত

২০