গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের দূর্গম চর মজলিশপুর ও চর মহিদাপুর গ্রাম। এই গ্রামে রয়েছে শত শত বিঘা খাস জমি। এসব জমি থেকে অবৈধ ভাবে প্রভাবশালী একাধিক গ্রুপ বিভিন্ন ইটভাটায় অবৈধ ভাবে মাটি বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মাটি বিক্রি চক্রের সদস্যরা দাবি করেছেন প্রশাসন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ম্যানেজ করেই চলছে তাদের এই অবৈধ মাটি বিক্রির কর্মযজ্ঞ।
এদিকে এই মাটি বিক্রি নিয়ে চরাঞ্চলে একাধিক গ্রুপের মধ্যে রয়েছে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। এতেকরে মাঝে মধ্যেই এক পক্ষ আরেক পক্ষের উপর হামলা ও ভেকু (এক্সেভেটর) ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। অবৈধ উপায়ে এই অর্থ কামানোর প্রতিযোগিতায় ওই চরাঞ্চলে যে কোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা। হতাহতের ঘটনা ঘটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়ন ও ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী দূর্গোম চর মজলিসপুর এবং চর মাহিদাপুর। তিন দশক আগে পদ্মার বুকে জেগে ওঠে এই চর। দেশের আইন অনুযায়ী বিস্তৃর্ণ এই চরের জমি খাস হিসেবে খতিয়ান ভুক্ত। কিন্তু এখানে পূর্বপুরুষের জমি হিসেবে দখলে নেয় অনেকেই। পদ্মাতীরবর্র্তী পলিমাটি সমৃদ্ধ এই এলাকায় যে কোন কৃষি ফসলের বাম্পার ফলন ফলে থাকে। উর্বর এই কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করছে প্রভাবশালী একাধিক চক্র। দিনের আলোতে মাটি বিক্রি না চললেও রাতের অন্ধকারে জেগে ওঠে মাটি কাটার সরঞ্জাম। মাটি কেটে ট্রাকে করে ফসলি জমির মধ্যে দিয়ে চলে যায় বিভিন্ন ইটভাটায়। প্রভাবশালী এই চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় কোন কৃষক মুখ খোলার সাহস টুকু পর্যন্ত পায় না। অবৈধ এই মাটি কাটা চক্র মূলত দু’টি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। একটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে মাসুদ গং ও অপর গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ করে আলেফ গং।
সরেজমিন দেখা যায়, ভেকু (এক্সেভেটর) ব্যবহার করে কৃষি জমি থেকে বিশাল বিশাল গর্তকরে মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। তবে দিনের আলোতে ভেকুগুলো বন্ধ রয়েছে। এখানে চোখে পড়ে ভাঙচুরের শিকার একটি ভেকু। এই ভেকু সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আলেফ গংদের ভেকুটি মাসুদ গংদের লোকজন ভাঙচুর করে ব্যাটারি খুলে নিয়ে গেছে। ফলে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
এসময় কথা হয় ভাঙচুরের শিকার ভেকুর চাকল মো. রাজীবের (৩০) সাথে। তিনি জানান, মাটি কাটা শুরু করার পরপরই মাসুদের ছেলের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন এসে ভেকু ভাঙচুর করে ব্যাটারি খুলে নিয়ে গেছে।
মুঠোফোনে মাসুদের সাথে কথা বললে তিনি দাম্ভিকতার সাথে বলেন, তিনি তার বাপ দাদার জমিতে মাটি কাটছেন। এই জমি খাস কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের পূর্বপুরুষের জমি নদীতে ভেঙে গিয়েছিল, তাই খাস হয়েছে। তিনি আরো বলেন, পূর্ব পুরুষের জমি ছাড়া অন্যের জমি থেকে মাটি কাটলেও টাকা দিচ্ছেন তাদের। তিনি জানান, প্রশাসন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ম্যানেজ করেই এখানে মাটি কাটছেন তারা।
স্থানীয় কৃষক আক্কাস মৃধা (৫৫) জানান, এ এলাকায় মিষ্টি কুমড়া, বেগুনসহ নানা ধরনের ফসল প্রচুর পরিমানে চাষ হয়। অথচ সেই খেতের মধ্যে দিয়ে সারারাত মাটি কেটে বিক্রি করা হয়। ফসলি জমির মধ্যে দিয়ে ছোট-বড় ট্রাকে করে মাটি বিভিন্ন ভাটায় পাঠানো হচ্ছে। ফলে জমির ফসল চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, দেখেন কুমড়া গাছের উপর মাটির স্তর পড়ে গেছে। আমরা কথা বলার সাহস পাইনা এবং বিচার দেওয়ারও জায়গা নেই।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মো. রাশিদুল ইসলাম জানান, অবৈধ ভাবে মাটি বিক্রি চক্রের অভিযোগটি সম্পুর্ন ভিত্তিহীন। এই মাটি বিক্রির সাথে তাদের কেউ কোন ভাবেই জড়িত হওয়া সুযোগ নেই। কারণ তারা মাটি কাটা বা বিক্রির বিষয়ে তাদের তেমন কিছু করনীয় নেই। তারা শুধু প্রশাসন থেকে অভিযান পরিচালনা করলে সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকেন।
এ ব্যাপারে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, অবৈধ ভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে পদ্মাপাড়ের কলাবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। চর মজলিশপুর ও চর মহিদাপুর এলাকায় মাটি কাটার বিষয়টি অবগত ছিলাম না, খুব শীঘ্রই ওইখানে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এছাড়া মাটিকাটা চক্রের সাথে প্রশাসনের কেউ জড়িত নেই বলে তিনি জানান।
মন্তব্য করুন