রাজবাড়ীতে পুলিশের সামনে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানাকে মারধরের ঘটনার পর তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘আস্থা পোশাক শিল্প’ খুলতে না দেওয়া ও হত্যার হুমকির প্রতিবাদ ও মারধরের ঘটনায় জরিতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক জাকিয়া সুলতানা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বেলা ২টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আম্রকানন চত্বরে এ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে জাকিয়া সুলতানা বলেন, রাজবাড়ীর কাদেরিয়া সুপার মার্কেটের (কাপড় বাজার) প্রথম নারী দোকানমালিক তিনি। ২০১২ সাল থেকে তিনি কাপড় বাজারে ব্যবসা করছেন। তাকে অনুপ্রাণিত হয়ে বর্তমানে অনেক নারী কাপড় বাজারে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার কোনো কর্মচারী চলে যাওয়ার সময় আমাকে হেনস্তা করা হয়। এর প্রমাণ আগের থানায় করা অভিযোগ।’
সাবেক কর্মচারী শাহনাজ পারভীন বৃষ্টির বিষয়ে জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘বৃষ্টি মেয়েটি একদমই কাজ জানত না। তার তিন বাচ্চার অসহায়তার কথা বলে আমার কাছে কাজ চায়। এমনকি এটাও বলে সে পাঁচ বছর কাজ করবে। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। দুই মাস আগে তার বেতনও বাড়িয়েছি। কিন্তু যখনই জানতে পারলাম সে অন্য দোকানে ১ তারিখ থেকে নিয়োগ হয়েছে, আমি নিজেই তাকে কাজে আসতে মানা করি। ভয়েস মেসেজে বলে দিই, পরের মাসের ১০ তারিখে এসে বেতন নিয়ে যেতে।’
জাকিয়া সুলতানার অভিযোগ, গত ২৩ তারিখ রাতে ১২ থেকে ১৫ জনকে সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টি তার দোকানে অবৈধভাবে পেশিশক্তি প্রয়োগ করে বেতন আদায় করতে আসেন। এ ঘটনার সবকিছু তার দোকানের সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা আছে বলেও দাবি করেন তিনি। জাকিয়া বলেন, ‘এখন আপনারাই বলেন, এ পর্যায়ে আমার কী করণীয় ছিল? অবশ্যই বাজার কমিটিতে জানাব এবং এর বিচার চাইব। কিন্তু মজার বিষয় হলো, কমিটির কিছু লোক উল্টো আমাকে হুমকি দিয়ে যায়, যাতে আমি থানায় অভিযোগ না করি। করলে নাকি এখানে ব্যবসা করতে দেবে না।’ তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘কমিটি সমাধান দেবে না, থানাতেও যেতে দেবে না, তাহলে আমি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিচারের জন্য কোথায় যাব? আমার তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে আমি কি সরকারকে ট্যাক্স দিচ্ছি না? তাহলে সরকার আমাকে কী দিচ্ছে? থানায় ওসির সামনে আমাকে রাত ১২টা পর্যন্ত জিম্মি করে রাখে, জোর করে মুচলেকা নেয়। এটা কোন বাংলাদেশ?’ এমনকি আমাকে সংবাদ সম্মেলন করতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। যে কারণে সংবাদ সম্মেলন আমার বাসায় করার কথা থাকলেও বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে সংবাদ সম্মেলন করছি।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে জাকিয়া সুলতানা বলেন, তার নামে বৃষ্টি যে অভিযোগ ছড়িয়েছেন, সে বিষয়ে ঢাকা পুলিশের ডিআইজি তদন্ত পরিচালনা করেছেন। তার দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ডিআইজি, সিআইডি ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার কাজের পরিবেশ ও উদ্যোক্তা হিসেবে অবদানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের তদন্তে সত্য উদ্ভাসিত হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত কেন আমার দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে? আমার কর্মচারীদের রুজি-রোজগার বন্ধ, আমার তৈরি করা পোশাকসামগ্রী দোকানে আটকে থেকে নষ্ট হচ্ছে।’ একজন নারী উদ্যোক্তাকে এভাবে সামাজিক ও আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে কি না, এ প্রশ্নও রাখেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জাকিয়া সুলতানা দুটি দাবি তুলে ধরেন। প্রথমত, সাবেক কর্মচারী শাহনাজ পারভীন বৃষ্টি ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন জয়িতা পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তার সম্মান ক্ষুণ্ণ ও প্রকাশ্যে মানহানি করেছেন, এ অভিযোগ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, রাজবাড়ী বাজার কল্যাণ ব্যবসায়ী সমিতির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের উপস্থিতি ও প্রত্যক্ষ ইন্ধনে একজন জয়িতা পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তার গায়ে হাত তোলার মতো ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির দাবি জানান তিনি। জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘একজন নারী যখন শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে সমাজে নিজের পায়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে যদি এভাবে শারীরিক লাঞ্ছনা ও ব্যবসায়িক জিম্মিদশার শিকার হতে হয়, তবে ভবিষ্যতে কোনো নারী আর উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস পাবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি সমাধান করবেন বলে আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি।’ অনতিবিলম্বে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের সত্যের পক্ষে থেকে ঘটনার সঠিক চিত্র তুলে ধরার আহ্বান জানান জাকিয়া সুলতানা। সংবাদ সম্মেলনে তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কয়েকজন নারী কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ২৯ আগস্ট রাজবাড়ী কাপড় বাজারে ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে জাকিয়া সুলতানাকে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় নয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক ও নারী অধিকার সংগঠন মানববন্ধন করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
মন্তব্য করুন