‘বিশ মণ পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে এসেছি, কেনার মত কোন খদ্দের নেই। ঠিক মত কেউ জিজ্ঞাসাও করছে না। বাজারে যা দাম, তাতে খরচের সিকি টাকাও উঠবে না। এমন হলে পেঁয়াজ আবাদ করে আমরা বেঁচে থাকব কিভাবে? আমাদের সমস্যা দেখার কেউ নেই। পেঁয়াজের আবাদ করতে গিয়ে সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি। এছাড়া এনজিও থেকেও ঋণ করতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এই ঋণ আমি কিভাবে পরিষোধ করবো? আর পরিবার পরিজন নিয়ে চলবোই বা কিভাবে?’
গোয়ালন্দ বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা ষাটোর্ধ মো. সেকেন আলী সেক এ ভাবেই তার হতাশার কথা গুলো বলছিলেন। তিনি আরো বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই পেঁয়াজ বিক্রি করে আমাদের লোকসান হচ্ছিল। তবে এবার একেবারে পথে বসে গেছি। পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে আসলে চোখের পানি ফেলে বাড়ি ফিরতে হয়।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘লজ্জা থাকলে আগামীতে আর পেঁয়াজের আবাদ করব না।’ তার মত অনেক পেঁয়াজ চাষী একই ভাবে তাদের হতাশার কথা জানান।
মুড়িকাটা পেঁয়াজের ভরা মৌসুম চলছে পেঁয়াজ উৎপাদনে সারা দেশের মধ্যে তৃতীয় স্থানে থাকা রাজবাড়ীতে। মুড়িকাটা পেঁয়াজে ভরপুর পদ্মা পাড়ের রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বাজারগুলো। তবে পেঁয়াজের দাম কম হওয়ায় হতাশ কৃষকেরা। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি করে এক বুক হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তাঁরা বলছেন, প্রতি বছর পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। বর্তমান বাজার দামে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না।
রাজবাড়ী কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ী জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৭শ ৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন। বাম্পার ফলন হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে এ বছর প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদন খরচ হয়েছে ১ হাজার ৭২০ টাকা থেকে ১ হাজার ৯২০ টাকা।
গত এক সপ্তাহ পেঁয়াজের বাজার পর্যবেক্ষন করে দেখা গেছে, প্রতি মণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬শ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এতেকরে কৃষককে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক কৃষকের উৎপাদিত পেঁয়াজ ক্ষেতেই পড়ে আছে।
গত বুধবার গোয়ালন্দ উপজেলার নতুন পাড়া গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকদের পরিবারের নারী-পুরুষ মিলে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আনার জন্য প্রস্তুত করছেন। তারা জানালেন, এবার রোপণ মৌসুমে বীজের দাম কিছুটা কম থাকলেও অন্যান্য খরচ ছিল অনেক বেশী। যেমন সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশী। এসময় তারা হিসেব করে জানান, প্রতিমণ পেঁয়াজ উৎপাদনে এবছর তাদের দেড় হাজার টাকা উপরে খরচ হয়েছে।
উপজেলার বাহাদুরপুর পেঁয়াজের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজ গুলো পরিপক্ক হলেও কৃষক তা তুলছেন না। অনেক ক্ষেতে আবার অযতেœ আগাছা আর পেঁয়াজ একাকার হয়ে গেছে। কৃষকরা জানান, বাজার খারাপ হওয়ায় তারা পেঁয়াজ গুলো তুলছেন না তারা।
গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ফেলু মোল্লার পাড়া গ্রামের কৃষক মো. আবুল হোসেন জানান, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে খরচ হয় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি উৎপাদন হয় ৪০ থেকে ৪৫ মণ। আর যদি খুব ভালো ফলন হয় তবে ৫০ মণ হয়। বর্তমান পেঁয়াজের বাজার অনুযায়ী খরচের অর্ধেক দামও পাওয়া যাচ্ছে না। আজ (৫মার্চ) গোয়ালন্দ বাজারে ৭/৮শ টাকা মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। এবার পেঁয়াজের আবাদ করে আমার অন্তত পক্ষে ৮ লক্ষ টাকা লোকসান হবে।
গোয়ালন্দ বাজারের পেঁয়াজের আড়ৎদার মো. সুজন সারওয়ার জানান, পেঁয়াজের বাজার পড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্থ্য হচ্ছেন। তার আড়তের অনেক ব্যাপারী পেঁয়াজ কিনে ফেলে রেখে চলে গেছেন। কিন্তু দিনের পর দিন খোঁজও নিচ্ছেন না। তারা ঢাকার বাজার কম থাকায় হয়ত পেঁয়াজগুলো নিচ্ছেন না। তিনি আরো জানান, পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশী হওয়ায় দাম পড়ে গেছে। রোপন মৌসুমে গুটি পেঁয়াজের (বীজ) দাম কিছুটা কম থাকায় এবছর কৃষকরা পেঁয়াজ আবাদও বেশী করেছে। তাই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।
পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মো. আব্দুল হালিম সেক জানান, এখান থেকে পেঁয়াজ কিনে দেশের বিভিন্ন পেঁয়াজ মোকামে গিয়ে তাদের বিরম্বনায় পড়তে হচ্ছে। মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান দিয়ে বিক্রি করে আসতে হচ্ছে। তাই তাঁরাও পেঁয়াজ কম কিনছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সামনে ঈদ আসছে, হয়ত চাহিদা কিছুটা বাড়লে দামও কিছুটা বাড়বে।’
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসার সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এ বছর গোয়ালন্দে পোঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। পেঁয়াজের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বর্তমানে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। বাজার ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে। কৃষকদের সুবিধার্থে আসলে উৎপাদিত পণ্যের একটি মূল্য নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। তা না হলে পেঁয়াজের উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
মন্তব্য করুন