বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর এখন আর মৌসুমি রোগ না। এটি একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য হুমকি। প্রতি বছর বর্ষা এলেই ফিরে আসে এডিস মশার দাপট। অথচ এ আতঙ্ক সৃষ্টির পেছনে মূলে রয়েছে আমাদেরই অসচেতনতা, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জুন মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ১৯৯ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৮০ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ভর্তি আছেন ৩১০ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভাগীয় ও জেলা হাসপাতালে রয়েছেন ৭৭০ জন রোগী। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ইতিমধ্যে শতাধিক রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়ে অথবা জরুরী বিভাগে সেবা নিয়েছেন এই চলতি জুন মাসেই।
২০২৫ সালেও এখনও পর্যন্ত যে তথ্য উঠে এসেছে—তা আশঙ্কার পারদ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। যার মধ্যে নারী ১৭ জন ও পুরুষ ১৭ জন করে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৪৪ জনে।
২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বলে, ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখেরও বেশি রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—আমরা কেন বারবার একই ভুল করছি?
কেন প্রতিবছর নতুন করে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছি?
এর পেছনের মূল কারণটি হলো— জনসচেতনতার ঘাটতি, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, এবং প্রতিরোধের ব্যর্থতা।
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা Aedes aegypti নামক মশার কামড়ে ছড়ায়। এডিস মশা মূলত দিনে কামড়ায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের দিকে। তবে নগর প্রাঙ্গনে এ মশকী সারা দিনই কামড় দিতে পারে বলে গবেষকরা বলছেন। ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ রয়েছে—DEN-1, DEN-2, DEN-3, এবং DEN-4। একাধিকবার আক্রান্ত হলে রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।ডেঙ্গুর উপসর্গগুলো হলঃ হঠাৎ জ্বর (১০২–১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত), তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, গায়ে ব্যথা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি, ত্বকে র্যাশ, রক্তক্ষরণের প্রবণতা (severe dengue বা hemorrhagic dengue-এ)গুরুতর অবস্থায় রোগী শকে চলে যেতে পারে, রক্তচাপ কমে যায়, প্লেটলেট কমে গিয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয় এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।আমাদের ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা কিন্তু ভয়াবহ। ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার ছিল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে। শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০০’র অধিক রোগীর মৃত্যু হয়, যা একটি আতঙ্কজনক চিত্র তুলে ধরে।আমার অভিজ্ঞতা বলে, অনেক রোগীই হাসপাতালে আসেন দেরিতে—তখন রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গেছে, কিডনি-লিভার ফেইলিওরের আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেছে। এই দেরির মূল কারণই হচ্ছে সচেতনতার অভাব।
২০২৫ সালের প্রেক্ষাপট: আশঙ্কা কি আরও গভীর?
২০২৫ সালের শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন যে, দীর্ঘ বর্ষা, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও খোলা ড্রেনেজ সিস্টেমের কারণে এ বছরও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে।ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (DNCC) এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (DSCC)-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর প্রায় ৭০% বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের জুনে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR)-এর জরিপে বলা হয়, এ বছর নতুন করে DEN-4 সেরোটাইপটি সক্রিয় হয়েছে, যার সংক্রমণ জটিলতা আরও বেশি। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে, আমাদের রাজবাড়ী জেলায় গত বেশ কিছুদিন ধরে থেমে থেমে বারে বারে বৃষ্টি হচ্ছে। এডিস মশার প্রজননে এই বৃষ্টি বেশি সহায়ক।অসচেতনতা ও অবহেলা: মূল সমস্যা কোথায়?
ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় দায় আমাদের অসচেতনতা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা।
যেমনঃ
১. নিজের বাসার ছাদ, বারান্দা বা ড্রেন পরিষ্কার না রাখা।
২. অপ্রয়োজনীয় পানির পাত্র, ফুলদানি বা নির্মাণাধীন ভবনের খোলা অংশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার না করা
৩. মশারি ব্যবহার না করা, বিশেষ করে দিনে ঘুমানোর সময়।
৪. বাজারে বিক্রি হওয়া নিম্নমানের মশা নিধন ঔষধ ব্যবহারে অকার্যকর প্রতিরোধ।
৫. সরকারি উদ্যোগকে সহযোগিতা না করে দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপানো।একটা কথা এখন বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, ডেঙ্গু একটি সামাজিক রোগ — এটা প্রতিরোধের দায়িত্ব একা সরকারের নয়, বরং আমরা সবাই মিলে যদি সচেতন হই, তাহলেই প্রতিরোধ সম্ভব।
প্রতিরোধই হোক অগ্রাধিকার
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি সচেতন আন্দোলন প্রয়োজন ডেঙ্গু মোকাবেলায়।১। সপ্তাহে একদিন “নিজের বাড়ির চারপাশ পরিস্কার রাখি, ডেঙ্গু প্রতিরোধ করি” কার্যক্রম চালু করা
২। নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে না থাকে তা নিশ্চিত করা
৩। সিটি কর্পোরেশনের ওষুধ ছিটানো কার্যক্রমকে নিয়মিত তদারকি ও নজরদারি করা
৪। পরিবারে শিশুকে ডেঙ্গু সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া
৫। ডে-কেয়ার সেন্টার, স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজগুলোতে মশা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ
৬। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ সেবন না করা।
আমরা যদি মনে করি ডেঙ্গু কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা — তাহলে ভুল করব। এটি আমাদের সামাজিক, পরিবেশগত এবং নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিবছর নতুন করে কবর খুঁড়তে খুঁড়তে আমরা কি একবারও থেমে ভাবছি না — এই মৃত্যু আমাদেরও হতে পারত?
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি বলব, ডেঙ্গু থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় — সচেতনতা। আপনার একটি কাজ, একটি উদ্যোগ হয়তো আপনার পরিবারের প্রাণ বাঁচাতে পারে। আপনি যদি নিজে সতর্ক হন, তবেই সমাজকে সতর্ক করা সম্ভব। মনে রাখবেন— ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায় আমাদের সবার।

লেখকঃ ডাঃ রাজীব দে সরকার, সার্জারী বিশেষজ্ঞ। শিশু রোগ চিকিৎসক ও সার্জন। গবেষক। কলামিস্ট। ফেসবুকে লেখকঃ Blame it on Rajib
মন্তব্য করুন