সারা দেশে যখন হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলো, আমি আমাদের রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে সেদিন নিজে একটি হাম আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসা দিলাম ও ভর্তি দিলাম। সেদিন পর্যন্ত রাজবাড়ি জেলা সদর হাসপাতালে এই সংক্রামক ব্যাধি হাম/মিজেলস নিয়ে আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ০৩ জন।
যেহেতু অতি দ্রুত হামের এই আউটব্রেক হচ্ছে এবং শিশুরাও সহজেই সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছে, তাই মনে হলো এটা নিয়ে রাজবাড়ী জেলা বাসীর জন্য কিছু লেখা প্রয়োজন।
আপনারা তো ইতিমধ্যেই জানেন যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের জ্বর ও শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে অনেক শিশুর মধ্যে হাম (Measles) শনাক্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকাদানের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং জনবহুল পরিবেশে সহজ সংক্রমণের কারণে মাঝে মাঝে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি শিশুর অভিভাবক ও সমাজের অন্য সবার জন্য হাম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। 
হাম কি ধরণের রোগ?
হাম মূলত ‘মিজেলস’ নামের এক হাইলি-কনটেজিয়াস ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত মারাত্নক একটি রোগ। অনেক বেশী জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, লাল চোখ এবং জ্বরের চার দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে হাম আবির্ভূত হয়।
এই ভাইরাসটি শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর ইউমিউন সিস্টেম আংশিকভাবে ও সাময়িকভাবে অকার্যকর করে দেয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত হলে শিশু এর সেকেন্ডারি ইনফেকশন দেখা দেয়।
হামের টিকা কিভাবে দেওয়া হয়?
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুবার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। একবার ৯ মাস বয়সে আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৮৮ শতাংশ দুই ডোজ ‘এমআর’ টিকা নিয়েছে। তারা প্রায় সারা জীবনের জন্য হামের সংক্রমণ থেকে মুক্ত।
হাম রোগটি কেন শিশুদের জন্য ভয়ংকর?
হামের জটিলতা খুবই ভয়ংকর যেমন হাম পরবর্তী সময়ে প্রায়ই নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা, মারাত্মক অপুষ্টি, মস্তিষ্কের প্রদাহ সহ আরও অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন এ–এর মজুত মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে শিশুর চোখের পানি কমে যায় বা চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, এ থেকে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।
কোন শিশুর হাম হলে বাবা–মায়েরা কি করবেন?
১। কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
২। শিশুর শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে।
৩। এ সময় আক্রান্ত শিশুর খাবার, পানীয় ও অন্যান্য স্বাভাবিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ তাকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।
৪। হামে আক্রান্ত শিশুর যদি কোনো “বিপদচিহ্ন” যেমন শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, চোখের মণি ঘোলা হয়ে আসে বা মুখের ভেতর গভীর ঘা থাকে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। সেখানে শিশুকে আলাদা ওয়ার্ডে বা কেবিনে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে।
৫। যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয়, কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটা ভিটামিন এ ক্যাপসুল (মোট ৩টি) দিতে হবে।
কখন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে?
নিম্নলিখিত বিপদচিহ্ন দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসবেন।
১। শ্বাসকষ্ট
২। বারবার বমি
৩। খিঁচুনি
৪। অস্বাভাবিক নিস্তেজতা
৫। চোখের সমস্যা বা দৃষ্টি কমে যাওয়া
৬। মুখে গভীর ঘা এবং উচ্চ জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হওয়া
রাজবাড়ী জেলার অভিভাবকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
রাজবাড়ীর সন্তান হিসেবে aআমি এই নদী বিধৌত কিঞ্চিৎ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য আলাদা করে কিছু বলতে চাই। জপদ হিসেবে এখানে জন্ম নেওয়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শারীরিক পুষ্টি মাত্রা দুটোই কম। তাই আমাদের শিশুরা বেশী ঝুঁকিতে আছে। আমাদের প্রথম দায়িত্ব নিজের এলাকার শিশুদের সুরক্ষায় সচেতন হওয়া।
কিছু কাজ আমাদের করতেই হবেঃ
## টিকাদান নিশ্চিত করুন শিশুর বয়স অনুযায়ী ৯ মাস ও ১৫ মাসে এমআর (Measles-Rubella) টিকা অবশ্যই দিন টিকা মিস হয়ে গেলে দ্রুত নিকটস্থ টিকাকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন মনে রাখবেন, দুই ডোজ টিকাই পূর্ণ সুরক্ষা দেয় ।
## জ্বর ও র্যাশকে অবহেলা করবেন না শিশুর জ্বরের সাথে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান নিজে নিজে ওষুধ না দিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
## আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখুন র্যাশ ওঠার পর অন্তত ৫ দিন শিশুকে অন্যদের থেকে দূরে রাখুন স্কুল, মাদ্রাসা বা খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন ।
## পুষ্টি ও পরিচর্যায় গুরুত্ব দিন শিশুকে বেশি বেশি পানি, তরল খাবার ও পুষ্টিকর খাবার দিন বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যান (যদি প্রযোজ্য হয়) শিশুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখুন।
## ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দিন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরপর ২ দিন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দিন প্রয়োজনে ১৪ দিন পর অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া লাগতে পারে
## বিপদচিহ্নগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকুন নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিন— শ্বাসকষ্ট বারবার বমি খিঁচুনি অস্বাভাবিক ঘুম বা নিস্তেজতা চোখে সমস্যা বা দেখতে না পার…
## সংক্রমণ ছড়ানো রোধ করুন শিশুর হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢাকতে শেখান পরিবারের অন্য শিশুদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন ।
## গুজব নয়, সঠিক তথ্য বিশ্বাস করুন টিকা সম্পর্কে কোনো ভ্রান্ত ধারণায় বিভ্রান্ত হবেন না স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকের পরামর্শই অনুসরণ করুন ।
শেষ কথা হলো, রাজবাড়ীর প্রতিটি শিশুর সুস্থতা আমাদের সবার দায়িত্ব। হাম হয়ে গেলে হাসপাতালে এসে চিকিৎসক নার্সেরা শুধু সাপোর্টিভ চিকিৎসা দিবেন। তাই রোগ প্রতিরোধ করাই বেশি জরুরী। সময়মতো টিকা, সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসাই পারে হাম থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে। সচেতন অভিভাবকই সুস্থ শিশুর নিশ্চয়তা।
—–
লেখাঃ
ডাঃ রাজীব দে সরকার
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। গবেষক। কলামিস্ট
মন্তব্য করুন