নিজেকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন আমরা জেনে বা না জেনে নানা ধরনের ওষুধ সেবন বা ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু সেটি যদি হয় মেয়াদোত্তীর্ণ তাহলে শরীরে দেখা দিতে পরে বিভিন্ন ধরনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা।
মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিতরণের অভিযোগ উঠছে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের ফার্মেসীর বিরুদ্ধে। প্রায় দুই মাস আগে শেষ হয়ে যাওয়া মেয়াদী Esoral 40 (এসোরাল ৪০) ওষুধ আজও দেওয়া হচ্ছে রোগীদের হাতে। এদিকে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা’র পূর্বে থেকে হাসপাতালের ফার্মেসী থেকে রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেবার অভিযোগ রয়েছে।
রাজবাড়ী জেলার সর্বচ্চো চিকিৎসা সেবার স্থান রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল। জেলার ৫ উপজেলার প্রায় ১২ থেকে ১৪ লক্ষ মানুষের আধুনিক চিকিৎসা সেবার স্থান এই হাসপাতালটি। এখানে চিকিৎসক ও ওষুধ সংকট দীর্ঘ দিনের। সম্প্রতি হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যা থেকে আড়াইশ শয্যায় উন্নতি করা হয়েছে। এবং চিকিৎসক সংকট নিরসনে নেওয়া হয়েছে উদ্দ্যোগ।
সরজমিনে গিয়ে দেখাযায়, অন্যান্য দিনের মত আজ বুধবার (৩ জুন) হাসপাতালে জেলার বিভিন্নস্থান থেকে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ বিনামূল্যে সেবা নিতে এসেছেন। এসময় তারা টিকেট কেটে ডাক্তার দেখিয়ে ছোট ছোট স্লিপ হাতে ফার্মেসী থেকে ওষুধ নিচ্ছেন। তবে চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে না প্রয়োজনীয় ওষুধ। এবং সবচেয়ে কম দেওয়া হচ্ছে বেশি চাহিদাকৃত Esoral 40 (এসোরাল ৪০) ওষুধ। স্থানীয় বা সবাই এটিকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বলেই চেনেন। ওষুধটি ৪ টির বেশি পাচ্ছে না কোন রোগী। এ সময় ওষুধের গায়ে খোদাই করে মেয়াদ লেখা ছিল ৪ এপ্রিল ২০২৬। অর্থাৎ প্রায় দুই মাস আগেই শেষ হয়েছে ওষুধটির মেয়াদ। শহর, গ্রাম বা প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীদের দেওয়া হচ্ছে এই ওষুধ। সংবাদকর্মীর মাধ্যমে জেনে ফার্মেসীতে গিয়ে রোগীরা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের কথা বললেই বিতরণকারীরা তরিঘরি করে ওই ওষুধ ফেরত নিয়ে নতুন মেয়াদের ওষুধ দিতে থাকেন। এ সময় রোগীরা অন্যান্য ওষুধেরও মেয়াদ যাচাই-বাছাই করতে থাকেন।
এদিকে হাসপাতালের ফার্মেসীতে দ্বায়িত্বরতা জানান, স্টোর থেকে তাদের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। সেই ওষুধ তারা রোগীদের মাঝে বিতরণ করেন। একসাথে অনেক ওষুধ এনেছেন এরমধ্যে একটা কাটূর্নের কিছু গ্যাস্ট্রিাকের ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়েছে, যা ভুলে বিতরণ করা হয়েছে।অন্যান্য কাটূর্নের গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের মেয়াদ চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আছে। যে কারণে মূলত ভুল হয়েছে।
রোগী হাবিবুর রহমান বলেন, অসুস্থ বোধ করায় সকালে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে এসে টিকেট কেটে ডাক্তার দেখাই। তখন ডাক্তার বেশ কিছু ওষুধ লেখে। তারমধ্য থেকে হাসপাতালের ফার্মেসী থেকে গ্যাস্ট্রিকের ৪টি ট্যাবলেট সহ বেশ কিছু ওষুধ নেই। বাইরে এসে দেখি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের মেয়াদ নাই। প্রায় দুই মাস আগে শেষ হয়েছে মেয়াদ। সরকারী হাসপাতালে এসে যদি আমরা প্রতারিত হই, তাহলে যাব কোথায়।
আরেক রোগী হামিদুর রহমান বলেন, ওষুধের মেয়াদ নাই দেখে ফার্মেসীতে গিলে বললে ওনারা ভুল হয়েছে বলে নতুন করে ওষুধ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে এক পাতার দুই পাশ থেকে কাটা ৪টি ওষুধ দেয়। ওখানে কোন তারিখ বোঝা যাচ্ছে না। এখন তো চিন্তায় আছি। আর আপনি না বললে তো জানতাম না মেয়াদ শেষ হয়েছে। বাড়ীতে নিয়ে খেয়ে ফেলতাম।
জিসান নামের আরেক রোগী বলেন, যতগুলো ওষুধ দিয়েছে সবগুলো মেয়াদ লেখা থাকলেও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের মেয়াদ লেখা নাই, কারণ ওষুধের পাতা কাটা। মূলত আমরা মেয়াদ না দেখেই ওষুধ নিয়ে যাই। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল মেয়াদ দেখে দেওয়া। এখানে তাদের গাফেলতি আছে। বিষয়টি ছোট করে দেখার কিছু নাই।
নাম প্রকাশে অনইচ্ছুক নামে রোগীর এক স্বজন বলেন, আমার মা ঈদের আগে হাসপাতালে গিয়ে ওষুধ এনেছেন । বাড়ীতে আসার পর দেখি গ্যাস্ট্রিকের (এসোরাল ৪০) ওষুধের দুই মাস ও একটি মলমের মেয়াদ তিন মাস আগে শেষ হয়েছে। পরে সেগুলো ব্যবহার করতে দেই নাই। সরকারী হাসপাতালের সেবা যদি এমন হয় তাহলে আমাদের মত সাধারন মানুষের কি হবে?
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাঃ শেখ মোহাম্মদ হান্নান বলেন, হাসপাতালে নিয়মিত মনিটরিং করা হয় এবং মেয়াদোউত্তীর্ণ ওষুধ দেবার কোন সুযোগ নাই। আর আমাদের ওষুধও বেশি নাই। অনিয়ম হলে তদন্ত সাপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। বর্তমানে প্রতিদিন আউটডোরে নতুন টিকেটে প্রায় ১৩০০ ও পুরানো সহ প্রায় ১৬০০ রোগী সেবা নিচ্ছেন। ফলে আউটডোর ও ইনডোরে অনেক ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তিনি আরও বলেন, সরকারী বা বেসরকারী পর্যায়ে কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিতরণের কোন সুযোগ নাই। ওষুধের মেয়াদ শেষের কাছকাছি আসলে আমরা সকলকে সকর্ত করি এবং দ্রুত ওষুধ শেষ করতে বলি। মেয়াদ একদিন ওভার হলেও সে ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহারের ফলে শরীরে নানাবিধ সমস্যা হতে পারে। এরমধ্যে লিভার ও কিডনি বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
মন্তব্য করুন