মাত্র এক মাস বয়স ছোট্ট আল আকসার। পৃথিবীর এই নির্মল আলো, মায়ার স্পর্শ, বাবার স্নেহ—এসবের কোনোটাই এখনো বোঝার মতো বয়স হয়নি তার। কিন্তু জন্মের পর থেকেই যেন ভাগ্যের নির্মম বাস্তবতার শিকার এই নিষ্পাপ শিশু। মা–বাবার বিরোধের মাঝে পড়ে সে আজ বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। প্রশ্ন একটাই—এই নিষ্পাপ শিশুটির অপরাধটা কোথায়?
রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের বহরের কালুখালী গ্রামের মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক মোল্লার মেয়ে মোছাম্মদ নিহার খাতুনের বিয়ে হয় ২০২৪ সালে পাংশা উপজেলার বনগ্রামের আব্দুল গফুর মন্ডলের ছেলে আখতারুল ইসলামের সঙ্গে। শুরুতে তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসা আর স্বপ্নে ভরা। নতুন সংসার, নতুন আশা—সবকিছু মিলিয়ে যেন সুখের গল্পই লিখছিল তাদের জীবন। কিন্তু সেই সুখের গল্প খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ধীরে ধীরে সংসারে শুরু হয় অশান্তি। নিহার খাতুনের অভিযোগ, যৌতুকের টাকার জন্য তাকে প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। প্রতিনিয়ত মারধর, অপমান আর ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। এরই মধ্যে নিহারের গর্ভে আসে একটি সন্তান। কিন্তু মাতৃত্বের সেই সময়েও থামেনি নির্যাতন। বরং আরও অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থ হয়ে পড়লে নিহার তার স্বামীকে অনুরোধ করেছিলেন তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তু সেই অনুরোধের প্রতিদান হিসেবে তাকে সহ্য করতে হয় আরও নির্যাতন। একসময় তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়লে তাকে পাংশার একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। সেখান থেকে আর তাকে স্বামীর বাড়িতে নেওয়া হয়নি। যৌতুকের টাকার দাবিতে বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়িতে। ইতিমধ্যে সময় গড়িয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাস পর জন্ম নেয় ছোট্ট আল আকসা—একটি নতুন প্রাণ, নতুন আশা। কিন্তু জন্মের পর থেকেই যেন সে বঞ্চনার গল্প নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। নে
নিহার খাতুনের দাবি, এই পুরো সময়ে একবারের জন্যও তার স্বামী আখতারুল ইসলাম স্ত্রী বা সন্তানের কোনো খোঁজ নেননি।
নিহার বহুবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া মেলেনি। বরং পরে তারা জানতে পারেন, আখতারুল নাকি আর একটি বিয়ে করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ জানুয়ারি রাজবাড়ী আদালতে যৌতুক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নিহার খাতুন। নিহারের আরও দাবি, আখতারুলের আগেও একটি বিয়ে করে ছিল—যার কথা তিনি বিয়ের সময় জানতেন না।
নিহারের ভাই রাজীব জানান যে, তাঁর বোন নিহারের সঙ্গে আক্তারুলের বিয়ের সময় আক্তারুল একটি ভুয়া পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি তৃতীয় বিয়ের সময় যে আইডি কার্ড ব্যবহার করেন, সেখানে তাঁর বয়সের ক্ষেত্রে প্রায় ১৩ বছরের বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। এছাড়াও আরও জানা যায় যে, এর আগেও তিনি একটি বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু সেই বিষয়টি নিহার বা তার পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল।
রাজীবের অভিযোগ, এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে এবং ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে আক্তারুল তাঁর বোনের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি আরও জানান, আক্তারুল ব্যাংকের মাধ্যমে মোটরসাইকেল কেনার জন্য ২,৭৫,০০০ (দুই লক্ষ পঁচাত্তর হাজার) টাকা নেন। পরে তাঁর বোনের ব্যবহারের জন্য দেওয়া প্রায় ২.৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার আটকে রেখে আরও টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। গহনা ফেরত নিতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। রাজীব আরও বলেন, গত ২৩ তারিখে আক্তারুল তাদের বাড়িতে এসে ৫ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করেন এবং হুমকি দেন যে টাকা না দিলে তিনি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে কোনোভাবেই গ্রহণ করবেন না। এ ধরনের চাপ ও হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে ২৮/০১/২০২৬ তারিখে যৌতুকের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তবে আখতারুল ইসলামের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি নিহারের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিহার তাকে তার বাবার বাড়িতে গিয়ে থাকতে বলেছিলেন। তিনি এতে রাজি না হওয়ায় নিহার তার সঙ্গে অশান্তি শুরু করেন এবং একসময় নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এমনকি তিনি দাবি করেন, নিহারের সন্তানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সন্তান তার নয়।
এদিকে জানা যায়, গত অক্টোবর মাসে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মো. বিশারত শেখের মেয়ে জান্নাতুল খাতুনকে বিয়ে করেছেন আখতারুল ইসলাম। যদিও তিনি সেই বিয়ের কথাও অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, নিহারকে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি তিনটি উকিল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু নিহার ফিরে আসেননি। বরং বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় তিনি ছয় লাখ টাকা নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেন আখতারুল এবং এ বিষয়ে তিনি মামলাও করেছেন।
অন্যদিকে স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, আখতারুলের স্ত্রী নিহার চলে যাওয়ার পর আখসারুল সত্যিই আর একটি বিয়ে করেছেন সংসার দেখাশোনার জন্য। আক্তারুল ভয় পাচ্ছে এই কারণেই তা অস্বীকার করেছেন।
সংশ্লিষ্ট কাজী জানান, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী আখতারুল ও জান্নাতুলের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়েটি নিবন্ধন করা সম্ভব হয়নি।
সব অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগের মাঝে আজও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে একটি নিষ্পাপ জীবনের ভবিষ্যৎ। মাত্র এক মাস বয়সী আল আকসা কিছুই বোঝে না। কিন্তু তার জীবনের শুরুটাই যেন বঞ্চনা আর অশ্রুর গল্প।
মা–বাবার দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত এই শিশুটির দিকে তাকিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন,এই নিষ্পাপ শিশুটি কী অপরাধ করেছিল?
মন্তব্য করুন