আমাদের দেশের মা-বোনদের নিজেদের অসুখ লুকিয়ে রাখার এক আবহমান প্রবণতা আছে। আর এই রোগ / সমস্যাটা যদি হয় ব্রেস্টের, তাহলে তো আর কথাই নেই। রোগ একেবারে শেষ পর্যায়ে বা চরম আকার ধারণ না করা পর্যন্ত অনেকে কাছের মানুষটার কাছেও মুখ খুলতে চান না। আর হয়তো একারনে ব্রেস্ট ক্যান্সার এর অধিকাংশ রোগী দুরারোগ্য স্টেজে আমাদের কাছে এসে হাজির হন এবং দুর্বিসহ পরিণাম ভোগ করেন।
সাভারের এক গার্মেন্টসকর্মী রেশমা খাতুন (ছদ্মনাম), বয়স ৩৮ বছর। তিন মাস যাবত বাম স্তনে একটি গোল শক্ত চাকা অনুভব করছিলেন। কিন্তু লজ্জা, ভয় ও গার্মেন্টস ছুটি পান নি দেখে চিকিৎসকের কাছে যান নি। এক সময় ব্রেস্টের আকার অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায়েবং স্কিনের উপরে গর্ত গর্ত ঠোস পরার পরে একজন সহকর্মীর সঙ্গে ঢাকায় আসেন। তখন রোগটি স্টেজ থ্রি-তে পৌঁছে গেছে। রোগের বিষয়ে তাকে সব কিছু বুঝিয়ে বললাম। যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাকে ক্যান্সার বিষয়ে নিশ্চিত করলাম। এখন তিনি কেমোথেরাপি নিচ্ছেন।
এই গল্পটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় — সঠিক তথ্য, নিকটবর্তীদের সাহস এবং চিকিৎসার সুযোগ না পেলে হাজারো রেশমার জীবন সংকটে পরবে এবং পরিণাম হবে ভয়াবহ। স্তন ক্যান্সার বা ব্রেস্ট ক্যান্সার — নারীদের মধ্যে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। বাংলাদেশে গত দুই দশকে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। একদিকে রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, অন্যদিকে কুসংস্কার ও আর্থসামাজিক প্রতিবন্ধকতা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসক হিসেবে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় আমি যেসব নারীকে দেখি—তাদের অনেকেই দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন, যখন রোগটি চতুর্থ বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অথচ এই রোগটি প্রতিরোধযোগ্য, নির্ণয়যোগ্য এবং নিরাময়যোগ্য (যদি যথা সময়ে ধরা পরে) এই ছোট্ট লেখায় আমি স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ কারণসমূহ, প্রতিরোধ, নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। আশা করি এটি পাঠকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
স্তন ক্যান্সার তখনই হয়, যখন স্তনের টিস্যুগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিভাজিত হয়ে টিউমার তৈরি করে। এই টিউমার যদি পার্শ্ববর্তী টিস্যু ও শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা মারাত্মক হয়ে ওঠে। এটি মূলত মহিলাদের রোগ হলেও, পুরুষদেরও এই রোগ হতে পারে—তবে তা তুলনামূলকভাবে বিরল।
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ২০ জন নারীর মধ্যে অন্তত একজন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। এই হার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে নতুন স্তন ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতি বছরের হিসেবে ৩২ লাখেরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা। গবেষকরা বলেছেন, ১১ লাখেরও বেশি নারীর মৃত্যু ঘটবে স্তন ক্যান্সারে।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং এদের মধ্যে অধিকাংশই দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্যান্সারজনিত নারীদের মৃত্যুর মধ্যে স্তন ক্যান্সার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
কাদের স্তন ক্যান্সার হবার ঝুঁকি বেশি?
১. বয়স: ৪০ বছরের পর থেকে ঝুঁকি বাড়ে। তবে আজকাল অনেক তরুণীও আক্রান্ত হচ্ছেন।
২. পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারের মা, খালা, বোন বা দাদির স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি বেশি।
৩. হরমোনাল কারণ: দেরিতে সন্তান নেওয়া, স্তন্যদান না করা, দীর্ঘদিন হরমোন থেরাপি নেওয়া ইত্যাদি।
৪. লাইফস্টাইল: মোটা হওয়া, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, মদ্যপান ও চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস।
৫. জেনেটিক মিউটেশন: BRCA1 এবং BRCA2 নামক জিনে পরিবর্তন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়।

কি কি লক্ষণ বা উপসর্গের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে? - স্তনে চাকা বা গাঁট অনুভব করা - স্তনের গঠন বা আকারে পরিবর্তন - স্তনের ত্বকে ডিম্পল পড়া বা কুঁচকে যাওয়া - স্তনবৃন্ত (নিপল) ভিতরে ঢুকে যাওয়া - নিপল থেকে রক্ত বা অন্য কোন তরল নিঃসরণ - স্তনে বা বগলের লসিকা গ্রন্থি (lymph node) ফুলে যাওয়া এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে ভয় না পেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ নারী স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। গ্রামীণ এলাকায় কুসংস্কার, ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং সামাজিক সংকোচনার কারণে নারীরা চিকিৎসার দ্বারস্থ হন দেরিতে। অথচ সচেতনতা, সময়মতো স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অবলম্বন করলে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব।
কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়ঃ ১. নিয়মিত ব্রেস্ট সেল্ফ এক্সামিনেশন (BSE): প্রতি মাসে নিজেই স্তন পরীক্ষা করুন। ২. স্ক্রিনিং: ৪০ বছরের পর থেকে নিয়মিত ম্যামোগ্রাম (একটি বিশেষ ধরণের এক্স-রে) করানো উচিত। ৩. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: পরিমিত ওজন বজায় রাখা, শারীরিক ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ। ৪. ব্রেস্ট-ফিডিং: স্তন্যদান শুধু শিশুর জন্য নয়, মায়ের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়। আশার আলোর কথা বলি। বর্তমানে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে নিরাময় সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি। চিকিৎসা পদ্ধতি রোগীর অবস্থা, ক্যান্সারের ধরন ও পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসার জন্য আমাদের হাতে আছে নানা অপশন। যেমনঃ ১. সার্জারি: টিউমার অপসারণ করতে হয়। অনেক সময় পুরো স্তন (মাস্টেক্টমি) বা অংশবিশেষ (লাম্পেক্টমি) কেটে ফেলা হয়। ২. কেমোথেরাপি: ওষুধ দিয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়। সাধারণত অপারেশনের আগে বা পরে প্রয়োগ করা হয়। ৩. রেডিওথেরাপি: রেডিয়েশন দিয়ে অবশিষ্ট ক্যান্সার কোষ নষ্ট করা হয়। ৪. হরমোন থেরাপি: ক্যান্সার যদি হরমোন-সংবেদনশীল হয়, তাহলে এই থেরাপি কার্যকর। ৫. টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি: আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেটি নির্দিষ্ট প্রোটিন বা জিনকে লক্ষ্য করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে। বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও ক্যান্সার সেন্টারে প্রদান করা হচ্ছে। যেমনঃ
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

সামাজিক আন্দোলন গড়ে না তুললে ব্রেস্ট ক্যান্সার ঠেকনো যাবে না। ১. সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা: টেলিভিশন, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ২. গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ: তারা যেন প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারেন। ৩. নিম্ন আয়ের নারীদের জন্য বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ক্যাম্প: NGO ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা যেতে পারে। ৪. ব্রেস্ট ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস মাস (অক্টোবর) উপলক্ষে সারা বছর কার্যক্রম: শুধুমাত্র অক্টোবরেই সীমাবদ্ধ না রেখে বছুরভর কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। স্তন ক্যান্সার নিয়ে ভ্রান্তি দূর করা: ধর্মীয়, সামাজিক বা কনজারেভেটিভ ধারণাগুলোর সংস্কার দরকার, যেন কেউ এই রোগটিকে গোপন না রাখে। একটা কথাই বলতে চাই, স্তন ক্যান্সার কোনো মৃত্যুপরোয়ানা নয়। এটি একটি নিরাময়যোগ্য রোগ—যদি সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়। আমাদের সমাজে নারীরা অনেক সময় নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে রাখেন—পরিবারের দায়িত্ব, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা অজানা ভয় তাদেরকে চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত করে। অথচ একজন নারী সুস্থ থাকলে পরিবার, সমাজ ও জাতি সুস্থ থাকে। একজন চিকিৎসক ও ব্রেস্ট সার্জন হিসেবে আমি সকল নারীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানাই — নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের শরীরের প্রতি যত্নবান হোন। সন্দেহজনক কিছু মনে হলেই দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। আপনার সচেতনতা শুধু আপনাকেই নয়, আপনার পরিবার, সন্তান এবং প্রজন্মকেও রক্ষা করবে।
লেখাঃ ডাঃ রাজীব দে সরকার। সার্জারী বিশেষজ্ঞ। কলামিস্ট।
Facebook-এ লেখকঃ Blame it on Rajib
মন্তব্য করুন