
ঈদুল আযহা উদ্যাপন শেষে কর্মস্থলগামী যাত্রীদের নিরাপত্তায় ফেরিতে বাস উঠার আগে বাসের সকল যাত্রীদের নামিয়ে দিতে বেশ কিছুদিন ধরেই দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আর এতেকরেই ভয়াবহ আরেক দূর্ঘটনায় হতাহতের হাত থেকে রক্ষা পেল প্রায় অর্ধশত মানুষ।
সম্প্রতি ঘাট এলাকায় দেখা যায়, প্রতিটি বাস ফেরিঘাটে আসলে সেখানে উপস্থিত হয় বিআইডব্লিউটিসি, নৌপুলিশ ও গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশ। সেখানে সকল যাত্রীদের নামিয়ে শুধু চালক ও হেলপার বাসটি চালিয়ে ফেরিতে ওঠে। আর এই সতর্কতার কারণে শুক্রবারের বাসডুবির ঘটনায় প্রাণে বাঁচে অর্ধশত কর্মস্থলগামী মানুষ।
এ বিষয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যাত্রী নিরাপত্তায় ফেরিতে উঠার আগে প্রতিটি বাস যাত্রী শুন্য করতে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই প্রচুর বেগ পেতে হয়। অনেক যাত্রী আমাদের এ কাজে সহযোগিতা করলেও অনেকেই নামতে চায় না। তাদের অনেক রকম করে বুঝিয়ে নামাতে হয়। আজ যদি বাসটি যাত্রীবোঝাই থাকতো তবে কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হতো না।’
এর আগে শুক্রবার (৫জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের বাসটি করবি ফেরিতে ওঠার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেরির র্যাম ভেঙে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। দ্রুত বাসের চালক ও তাঁর সহকারী ডুবে যাওয়া বাস থেকে বের হয়ে এলে তাদেরকে উদ্ধার করো গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। আহত বাসের চালক মো. ঝন্টু আলী (৪৮) কুষ্টিয়া জেলার সদর উপজেলার আলমপুর গ্রামের মৃত মেছের আলীর ছেলে ও তার সহকারী মো. সাবিক (২১) একই এলাকার মো. আবু তালেবের ছেলে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ৭ কর্মদিবসের মধ্যে দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
দূর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া বাসের যাত্রী কুষ্টিয়ার সোমাইয়া আক্তার (২২) জানান, তিনি বাসটির পেছনের দিকে ছিলেন। দৌলতদিয়া ঘাটে আসার পর পুলিশ বাসের সকল যাত্রীদের নেমে ফেরিতে উঠার নির্দেশ দিচ্ছিল। সামনের দিকের যাত্রীরা নির্দেশ অনুযায়ী বাস থেকে নেমে গেলেও পেছনে থাকা যাত্রীরা বিশেষ করে নারী যাত্রীরা বাস থেকে নামতে আপত্তি করছিল। কারণ তাদের কারো কারো সাথে শিশু ছিল। কিন্তু কর্তব্যরত পুলিশরা তাদের অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাস থেকে নামতে বাধ্য করে। এরপর কয়েক মুহুর্তের মধ্যে চোখের সামনে যখন বাসটি পদ্মায় ডুবে যায়, তখন তাদের মধ্যে আতঙ্ক, ভীতিকর পরিবেশ সেই সাথে অনুসোচনার সৃষ্টি হয়।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন বাসের চালক ঝন্টু আলী (৪৮) বলেন, ‘শুক্রবার সকাল সোয়া সাতটার দিকে কুষ্টিয়ার মদনপুর থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই। বাসে ৩৭ জন যাত্রী, চালক, সহকারীসহ প্রায় ৪০ জন ছিলেন। দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটের রোরো ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ভেড়ানো ছিল। অপর পকেটে কে-টাইপ ফেরি করবী ছিল। নিয়ম অনুযায়ী ঘাটে যাত্রীদের নামতে আহ্বান করা হয়। অনেকে নামতে না চাইলে পুলিশ তাঁদের নামিয়ে দেয়। এ সময় আমি ও আমার সহকারী ফেরিতে ওঠার জন্য গাড়ি টান দেই। তখন গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি করবী ফেরির র্যামে আঘাত করে। র্যাম ভেঙে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। পরে বাসের জানালা দিয়ে কোনোভাবে বের হয়ে আসি। স্থানীয়রা আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে।’
বাসটির যাত্রী বিজিবির সদর দপ্তরের নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আবদুস সালাম জানান, তিনি মাঝেমধ্যে এই পরিবহনে ঢাকা যাতায়াত করেন। এর আগে তিনি কখনো ফেরিঘাটে বাস থেকে নামেননি। দীর্ঘদিনের অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় ফেরি ঘাটে বাসটি পৌঁছানোর পর যাত্রীদের নামার আহ্বান জানায় পুলিশ। আমি নামতে রাজি হচ্ছিলাম না। পরে পুলিশ আমাকে একরকম জোর-জবরদস্তি করে নামিয়ে দেয়। এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাসটি ফেরির র্যাম ভেঙে নদীতে পড়ে যায়।
গত ২৫ এপ্রিল দৌলতদিয়া ৩নং ফেরি ঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস পন্টুন থেকে পড়ে পদ্মা নদীতে ডুবে গেলে নারী ও শিশুসহ ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার পর আবারও বাস ডুবির ঘটনায় স্থানীয়রা ছাড়াও এ রুট দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
দৌলতদিয়া ঘাটে কর্মরত বিআইডব্লিউটিসির প্রান্তিক সহকারী কাজী নবীন জানান, গত ২৫ এপ্রিল বাস ডুবির ঘটনার পর থেকেই আমাদের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বাস ফেরিতে উঠার পূর্বে সকল যাত্রী নামিয়ে দেয়ার নির্দেশ জারি করে। এরপর থেকেই আমরা প্রতিটি বাস ফেরি ঘাটে আসলে যাত্রীদের নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে ফেরিতে যাওয়ার অনুরোধ করি। কিন্তু দুঃখের বিষয় অনেক যাত্রী আমাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে এবং আমাদের সাথে বাগবিতান্ডায় জড়ায়। তবে বর্তমানে ঈদ শেষে কর্মস্থলগামী মানুষের অতিরিক্ত চাপ থাকায় ঘাট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। তাই আমরা প্রতিটি বাস থেকে শতভাগ যাত্রী নামিয়ে শুধু বাসের চালক ও সহকারী বাস নিয়ে ফেরিতে উঠা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি।
ফায়ার সার্ভিসের ফরিদপুর অঞ্চলের পরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে চালক ও হেলপারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরে ডুবুরি দল ও উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তমের সহায়তায় প্রায় ৩ ঘন্টা চেষ্টা করে বাসটি উদ্ধার করে।
বিআইডব্লিউটিসি’র সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, ‘বাসটি সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঘাটে পৌঁছানোর পর আমরা হ্যান্ডমাইকে যাত্রীদের নিচে নেমে যাওয়ার আহ্বান জানাই। এসময় কর্তব্যরত পুলিশ এসে আমাদের সহযোগিতা করে। এরপর মুহুর্তের মধ্যে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে করবী ফেরির র্যাম ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। বাসটিতে কোনো যাত্রী না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।’
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, ‘সবাইকে সচেতন হতে হবে। আজকের সচেতনতার কারণেই এতগুলো প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। আমরা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ থেকে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে দিচ্ছি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া বাসে থাকা মালামাল উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে যাত্রীদের ফেরত দেওয়া হবে।’
মন্তব্য করুন