মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চললেও রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে চলছে তার উল্টো চিত্র। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রকাশ্যে পদ্মায় চলছে ইলিশ শিকার ও বিক্রি। পেটের দায়ে নদীতে নামার কথা বললেও সরকারি সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভ জানিয়েছেন জেলেরা।
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান (৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর) । এই ২২ দিন নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি মাছ পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, বেচা-কেনা ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু ভিন্ন চিত্র রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামমাত্র টহলের পরেই নদীতে নেমে ইলিশ ধরছেন শতশত নৌকা এবং ঘন্টার পর ঘন্টা তারা নদীতে অবস্থান করলেও যেন দেখার কেউ নাই। এ সময় তারা জাল ফেলে কিছু সময় অপেক্ষার পর টেনে তুলে নদীর পাড়ে এসে জাল গোছানো সহ করছেন মাছ বিক্রির কাজ।
এদিকে মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে এখন পর্যন্ত ১১ দিনে রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে ৩৯ টি অভিযান ও ৭ টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় জব্দ করা হয়েছে ৬ লক্ষ ৫৫ হাজার মিটার এবং ১৪২ কেজি ইলিশ। ২২ জন জেলেকে আটকের পর ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল এবং ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় ও ১০ জন জেলেকে নিয়মিত মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেই সাথে নিলামের মাধ্যমে আয় হয়েছে ২১ হাজার টাকা। এরমধ্যে দৌলতদিয়া নৌ-পুলিশ প্রায় ৩ লক্ষ মিটার জাল ও ৫৭ কেজি ইলিশসহ আটক করেছে ১০ জন জেলেকে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি ব্যাতিত জেলার ৪ উপজেলা রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ পদ্মা নদী বেষ্টিত। এখানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন । এরমধ্যে ইলিশ মাছ শিকারের সাথে জরিত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৪ জন থাকলেও বরাদ্দ সল্পতায় এবার সরকারী সহায়তার চাল পান নাই ৭১২ জন কার্ডধারী জেলে।
জেলে মফিজউদ্দিন বলেন, সরকারের দেওয়া অবরোধ কিভাবে মানবো, সংসার আছে তো। সেখানে তো কোন অবরোধ চলে না। আর অন্য কোন কাজও জানি না । ফলে বাধ্য হয়েই নদীতে নামতেছি। সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করুক, তারপর আর নদীতে নামবো না। আমার দুইটি মাছ ধরা নৌকা থাকার পরও জেলে কার্ড পাই নাই। ফলে কোন সহায়তাও পাই না। সহায়তা পায় ভ্যান চালক, কৃষকসহ অন্যান্যরা। সরকারের এ বিষয় গুলো দেখা উচিত। তাছাড়া সকাল থেকে দুপুরের পর পর্যন্ত তিনবার নদীতে জাল ফেলে এক কেজির মত মাছ পেয়েছি। মাঝে মধ্যে প্রশাসন এসে ধাওয়া দিচ্ছে।
আরেক জেলে ইমরান মিয়া বলেন, আগের অভিযানের সময় নদীতে অনেক মাছ পাওয়া গেছে, কিন্তু এবার মাছ নাই। পালিয়ে পালিয়ে সারাদিনে যা মাছ পাই তাতে তেল খরচই উঠতেছে না। মূলত সাগর থেকে ইলিশ মাছ মেরে ফেলায় নদীতে মাছ কমে গেছে। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ করতে পারলে নদীতে ডিম ছাড়তে মাছ আসবে। আর নিষেধাজ্ঞার সময় সব ধরনের সহায়তা করলে আমরাও নিষেধাজ্ঞা মানবো।
নাম প্রকাশে অনইচ্ছুক জেলেরা বলেন, নদীতে ৬/৭ বছর ধরে মাছ ধরলেও কার্ড হয় নাই। কিন্ত আমাদের ব্যবসা তো মাছ ধরা। বসে থাকলে তো আর সংসার চলবে না। তাই প্রশাসনের উপর লক্ষ রেখে নদীতে নামছি। এবং প্রশাসন নদীতে নামলেই আমরা খবর পাই। তারপরও অনেক সময় আমাদের ধরে নিয়ে জেলা-জরিমানা করছে এবং নষ্ট করছে জাল-নৌকা। তারা আরও বলেন, এবার বড় মাছ কম, ছোট মাছ বেশি। যা পাই নদীর তীরে বিক্রি করি। বিভিন্নস্থান থেকে মানুষ মাছ কেনার জন্য এসে বসে থাকে।
নাম প্রকাশে অনইচ্ছুক এক স্থানীয় বলেন, অভিযান তো হচ্ছে না। দিন-রাত নদীতে শতশত নৌকা মাছ ধরে। পুলিশ আসার আগেই জেলেরা খবর পেয়ে তীরে চলে আসে, কিছুক্ষণ পর আবার নদীতে নামে। এর সাথে একটি প্রভাবশালী মহল জরিত, যাদের নিজস্ব নৌকা আছে। তারা অন্যদের দিয়ে তারা মাছ ধরায়। আর সহায়তা যারা পায় তারাও মাছ ধরে, যারা পায় না তারাও ধরে। তবে প্রকৃত জেলেরা সহায়তা কম পায়।
স্থানীয় সিদ্দিক খান বলেন, যে ভাবে নদীতে মাছ ধরছে তাতে তো মনে হয় না অভিযান চলছে। প্রকাশে্য শতশত নৌকা মাছ ধরছে, অভিযানের আগেও এমন দেখা যায় নাই। প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই। প্রতিদিনই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইলিশ মাছ রক্ষায় কঠোর ভাবে অভিযান করা উচিত, নামমাত্র অভিযান যেন না দেওয়া হয়। নদী থেকে মাছ ধরে সেগুলো নদীর পাড়েই বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ দেখছে না। অনলাইনেও বিক্রি হয়। প্রতিদিন নদীতে আসি কিন্তু প্রশাসনকে দেখি না।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মাহবুব উল হক বলেন, নদীতে সার্বক্ষনিক পাহাড়া দেবার মত আমাদের সামর্থ্য নাই। প্রতিদিন সকাল, দুপুর, বিকাল বা সন্ধ্যায় অভিযান চলছে। তবে যখন আমাদের টিম নদীতে থাকছে না তখন হয়তো জেলেরা নামছে। তারপরও অভিযান সফল করতে সাধ্যমত চেষ্টা করছি। আর প্রকাশ্যে মাছ ধরা বা বিক্রির বিষয়টি শুনেছি, তবে সে গুলো ওই পাড়ের চর এলাকায়। ওখানে নৌ পুলিশ সহ প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে এবং অভিযান চলবে।
মন্তব্য করুন