করোনার ভয়াল স্মৃতি এখনো আমাদের মনে দগদগে হয়ে আছে। প্যানডেমিকে বিশ্বের সাথে সাথে একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এক দুঃসহ সময় পার করেছে।
একটূ পেছনের কথা বলি, ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর ২০২৫ সালের ১৪ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ২০ লাখ ৫১ হাজার ৮০৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ৫০২ জনের। নিঃসন্দেহে এই পরিসংখ্যান অনেক আতঙ্কের, কারন যার পরিবারে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেছেন, শুধু তারাই জানেন কি ঝড় গেছে তাদের উপর দিয়ে।
এবার আসি সাম্প্রতিক সময়ের গল্পে। ২০২৪ সালে কেউ মারা না গেলেও এ বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৫ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে বয়স্ক একজন ব্যক্তি, ১৩ জুন রাজধানী ঢাকায় ১ জন এবং চট্টগ্রামে ১ জন কোভিড-১৯ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই তিনজনের মৃত্যুই মূলতঃ নতুন করে আমাদের করোনা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের রাজবাড়ীর সর্ববৃহৎ সরকারী সেবা প্রতিষ্ঠান রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালকে আমরা প্রস্তুত করতে শুরু করেছি। আপনাদের হয়তো মনে আছে, করোনার সেই দুঃসহ সময়েও যখন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো, আপনাদের পাশে ছিলো আমাদের সরকারী হাসপাতাল গুলো। রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালও তখন রাজবাড়ী জেলার মানুষের সেবায় বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছিলো এবং মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলো।
তারই ধারাবাহিকতায় আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা এবারও আপনাদের পাশে নিরসলসভাবে থকবো। আপনাদের সেবা প্রদানে আমাদের আন্তরিকতার একটুও অভাব থাকবে না। ইতিমধ্যেই আমাদের জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ এস এম মাসুদ (২০ তম বিসিএস) মহোদয় এ বিষয়ক বেশ কয়েকটি জরুরী সভা ও অবহিত করণ সভা করেছেন। দফায় দফায় রোগীদের সেবা প্রদানে সর্বোচ্চ করণীয় বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।
হাসপাতালের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ জিয়াউল হোসেন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়েছেন ও ব্যবস্থাপনাও শুরু করেছেন। এমনকি পবিত্র হজ্ব পালতে দেশের বাইরে অবস্থান করা আমাদের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান অনলাইনে প্রতিনিয়ত যুক্ত থেকে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন ও তার পূর্ব অভিজ্ঞতা প্রদান করছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রাথমিক অবস্থায় আমরা ১০ বেডের একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করবো। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে আমরা এই বেড সংখ্যা বাড়ানোর সক্ষমতাও রাখি। কারণ করোনা সংক্রান্ত সেবার পাশাপাশি আমাদের অন্যান্য সাধারণ সেবাও চালু রাখতে হবে। নাহলে সাধারণ রোগীরা ভোগান্তিতে পরবেন যা আমাদের কাম্য নয়।
আমরা খুব শ্রীঘ্রই আমাদের হাসপাতাল ক্যাম্পাসে করোনার পরীক্ষা শুরু করবো এবং এ জন্য ঈদের আগেই আমরা নতুন টেস্টিং কিট সরবরাহের জন্য রিকুইজিশন প্রেরণ করেছি। প্রথম দফায় আমরা ৩০,০০০ কিট সরবরাহ করতে সংস্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাহিদা প্রেরণ করেছি। আমাদের চিকিৎসক , নার্স, মেডিকেল টেকনোলিজিস্ট ও সেবা প্রদানকারী অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীগণ মানসিকভাবেও নতুন এই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা প্রস্তুত আছেন।
আইসিডিডিআরবি’র তথ্যমতে, চলতি বছর সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো করোনার নতুন দুটো সাব-ভ্যারিয়েন্ট এক্সএফজি এবং এক্সএফসি। যেগুলো ওমিক্রন জেএন ১-এর একটি উপ-শাখা। সম্প্রতি যেসব নমুনা পাওয়া গেছে, তার প্রায় সবগুলোতে এক্সএফজি ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি।
তবে সংক্রমণ ক্ষমতা যাই হোক না, প্রতিরোধ কিন্তু আপনার হাতেই। যদিও আপনারা জানেন কি করতে হবে, আলোচনা শেষ করার আগে আপনাদের একবার মনে করিয়ে দিতে চাই।
১. মাস্ক পরাঃ
করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী একটি উপায় হচ্ছে নাক মুখ ঢেকে মাস্ক পরা। বিশেষ করে জনবহুল জায়গায়, গণপরিবহনে, অফিসে বা বাজারে মাস্ক না পরলে নিজের ও অন্যের জীবনের ঝুঁকি বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ভালো মানের সার্জিকাল বা KN95 মাস্ক সংক্রমণ সম্ভাবনা ৯০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। হাসপাতাল ও এর আশে পাশের এলাকায় এলে অবশ্যই মাস্ক পরতেই হবে। হাসপাতালে মাস্ক পরে না এলে সেবা না দেওয়ারও সরকারী নির্দেশনা রয়েছে।
২. হাত ধোয়ার অভ্যাসঃ
করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয় হাত ধোয়ার বেসিক নিয়ম মেনে চলা থেকে। অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া এবং প্রয়োজন হলে অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাঃ
অন্তত ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা করোনার মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অপরিহার্য। অপ্রয়োজনে ভিড় করা, ঘন ঘন মানুষের সঙ্গে শারীরিক সংস্পর্শে যাওয়া, করমর্দন কিংবা আলিঙ্গন না করাই ভালো।
৪. নিয়মিত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতাঃ
ব্যবহৃত বস্তু যেমন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, দরজার হাতল, লাইটের সুইচ ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত রাখতে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। কাপড়, চাদর ও মাস্ক গরম পানিতে ধুয়ে ফেলাও অত্যন্ত কার্যকর।
৫. সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮ এর সব কটি বিষয়ে মেনে চলতে হবে
৬. ভুয়া খবর ও গুজব প্রতিরোধঃ
আরেকটি বিষয় করোনা ভাইরাসের মতোই ভয়ংকর হচ্ছে, তা হচ্ছে গুজব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য অনেকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছেন—যেমন, রসুন খেলে করোনা হয় না, অথবা করোনা টিকা বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করে। এইসব মিথ্যাচার প্রতিরোধে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান, তথ্য যাচাই ও বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে শিক্ষা গ্রহণ। প্রয়োজনে জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন দিয়েও আপনারা যে কোন পরামর্শ পেতে পারেন।
শেষ কথা: অন্ধকারের পর আলো
করোনা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে — মানুষ আসলে কতটা অসহায়, আবার একসাথে হলে কতটা শক্তিশালী। আমাদের শত্রু অদৃশ্য, কিন্তু আমাদের অস্ত্র দৃশ্যমান—বিজ্ঞান, সচেতনতা, সহমর্মিতা, এবং একতা।
রাজবাড়ী জেলার সম্মানিত রোগীদের কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ থাকবে, আসুন, আমরা সবাই মিলে গড়ে তুলি একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, এবং মানবিক জনপদ। রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল আপনাদের সেবায় প্রস্তুত আছে। শুধু প্রয়োজন আপনাদের সহযোগিতা। ধৈর্য্য ও মানবিকতা নিয়ে হাসপাতালে সেবা নিন। চিকিৎসক ও নার্সদের সহযোগিতা করুন। ফেসবুকে কে বা কারা হাসপাতাল নিয়ে কি লিখলো সেটা বিশ্বাস না করে প্রয়োজনে সরাসরি হাসপাতালে আসুন এবং সেবা নিন।
যদি আবার দুঃসময় আসে, রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের থেকে বেশি ‘আপন‘ আপনাদের জন্য আর কেউ হবে না।
লেখকঃ ডাঃ রাজীব দে সরকার। সার্জারী বিশেষজ্ঞ। শিশু রোগ চিকিৎসক ও সার্জন। কলামিস্ট
মন্তব্য করুন