অন্যের চিকিৎসাসেবা ও প্রসবকালীন জটিলতা সামলানো যার পেশা, তিনি নিজেই আজ চিকিৎসকদের চরম অবহেলার শিকার হয়ে ৩ মাসেরও বেশী সময় মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে হেরে গেলেন।
বৃহস্পতিবার (৮অক্টোবর) সকাল সকড়ে আটটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে প্রসবকালীন সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক ভুল করে পেটের ভেতর গজ (মব) রেখে দেয়।
বিথী আক্তার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলা হাট এলাকার মো. রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী ও নার্স (পেশায় ডিপ্লোমা মিডওয়াইফ)।
ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিথী আক্তারের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রোপচারের সময় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে তার পেটের ভেতর গজ থেকে যায়। এরপর থেকেই তার শরীরে তীব্র যন্ত্রণা ও দীর্ঘ জটিলতা শুরু হয়।
শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হলে প্রথম অপারেশনের প্রায় দুই মাস পর ১৫ জুলাই আবারও বড় ধরনের অপারেশন করাতে হয়। এরপর চিকিৎসাধীন থাকাকালীন সময়ে অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে রাখা হয় কয়েকদিন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তার শারিরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। এক পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ৪ অক্টোবর নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকালে তার মৃত্যু হয়।
নিহতের স্বজনদের দাবি, অস্ত্রোপচারের সাথে জড়িত চিকিৎসক ডা. তামান্না ও ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. অরবিন্দ একবারের জন্যও তাদের খোঁজখবর নেননি। নিহত বিথীর স্বামী রাকিবুল ইসলাম জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এখন এই ছোট্ট শিশু বাচ্চাকে নিয়ে কি করবেন বুঝতে পারছেন না। চিকিৎসক সহ সংশ্লিষ্ঠদের অবহেলায় তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি মামলা করবেন। আর কারও সাথে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য দোষীদের সর্বচ্চো শাস্তির দাবি জানান। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা খুবই হতদরিদ্র পরিবার। এতদিন টিউশনি করে এবং বিথীর আয় দিয়ে সংসার চলতো। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিসাবে চুড়ান্ত সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছি। দু’এক দিনের মধ্যে পদায়ন হবে। ভেবেছিলাম আমাদের দুখের দিন শেষ হবে, তা না হয়ে কিছু মানুষের অবহেলায আমাদের জীবনে কালো অন্ধকার নেমে এলো।’
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের ঘরে একটি পুত্র সন্তান দিয়েছে। বিথী আদর করে ওর নাম রেখেছিল, হুজাইফা আল রাইয়ান। কিন্তু সেই সন্তানকে সে একটু ভালোকরে কলেও নিতে পারলো না। ডাক্তারদের উদাসীনতায় এই অবুঝ শিশুটি মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হলো। এর বিচার আমি কার কাছে চাইব।’
নিহত বিথীর চাচা শ্বশুর মো. হাতেম আলী জানান, রাকিবদের এই বাড়িটুকু ছাড়া কোন জায়গা জমি নেই। খুব কষ্ট করে ৪ ভাইয়ের মধ্যে রাকিবই লেখাপড়া করেছে। অন্য ভাইরা বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকের কাজ করে। এ পরিস্থিতিতে গত কয়েক মাসে বিথীর চিকিৎসা করতে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এরপর নানাজনের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে বিথীর চিকিৎসা করিয়েছে। তারপরও তাকে বাঁচাতে পারলো না।
সম্প্রতি বিথী আক্তার হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে ফেসবুকে আর্থিক সহযোগিতার জন্য পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘আমি বাঁচতে চাই, আমি আমার সন্তানের জন্য বাঁচতে চাই, আপনাদের আর্থিক সহযোগিতা পেলে হয়তো চিকিৎসা নিয়ে আমি আমার সন্তানকে বুকে নিতে পারবো’। কিন্তু তার সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নই থেকে গেল।
এদিকে গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বিথী আক্তারের স্বামীর বাড়ীতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সহযোগীতার আশ্বাস দেন এবং বিথী আক্তারের পুত্র সন্তানের জন্য বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করেন।
এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, বিথীর মৃত্যুর খবরটি আমি শুনেছি, অত্যন্ত দুঃখজনক। কয়েকদিন আগে বিথীর বাচ্চাকে দেখতে তিনি নিজে এবং গতকাল জেলা প্রশাসক গেছেন। এ ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। সেই সাথে ওই পরিবারের কোন সহযোগিতার সুযোগ থাকলে করা হবে।
মন্তব্য করুন