‘শুভ আমার গর্বের ছেলে। ওরে নিয়ে আমি সবার কাছে গর্ব করি। আমার গর্বের ধন শুভ’র সাথে ক্যান এমন হলো। ক্যান আমার সোনার ছেলে আমারে ছাইড়া চইলা গেল। ট্রেনিয়ের সময় ওর হাত বাইন্দা পানিতে ছাড়ছে, তখন তো ওর কিছু হইলো না।’ এ ভাবেই বিলাব করছিলেন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে দায়িত্ব পালনকালে ডুবে মারা যাওয়া ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভ’র মা লিলি আক্তার।
তিনি বলেন, ‘আমার সাদিককে দুই বছর আগে বিয়ে দিয়েছি। বউয়ের নাম সাদিয়া। সাদিক আর সাদিয়া মিলেমিশে কত সুন্দর একটি সংসার করছিল। আমার ব্যাটার মতো এমন ব্যাটা পৃথিবীতে আর একটাও নাই। এত ভালো ব্যাটা আমার কীভাবে মরল? দুই দিন আগেও আমার ব্যাটার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। এ সময় সাদিক জানায়, ‘মা, আমি আগামী রোববার বাড়ি আসতেছি। আমার ব্যাটা একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি। ও ক্যান পানিতে ডুবে মরবে। সন্তানের মৃত্যু নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন মা লিলি আক্তার। তিনি এ ঘটনার তদন্ত দাবি করেন। অকালে ছেলেকে হারিয়ে পাগল প্রায় মা’কে শান্তনা দেয়ার ভাষা জানা নেই যেন কারোই।
সাদিক হোসেন শুভ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি মহল্লার আশরাফ আলীর ছেলে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ারঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে জেটির সামনে কচুরিপানা পরিষ্কারের সময় নিখোঁজ হন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি সাদিক। প্রায় আট ঘণ্টা চেষ্টার পর সন্ধ্যা সাতটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা কেরসিন ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।
পরিবার জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকায় ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়ে শুক্রবার সাদিক হোসেনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর মরদেহ ওইদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে গোয়ালন্দে আনা হয়। এরপর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কুমড়াকান্দি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিসে যোগ দেন সাদিক। তিনি নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর ফায়ার সার্ভিসে ডুবুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানে সাহসিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে গত ১৯ মে তাঁকে প্রেসিডেন্ট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (সেবা) পদক দেওয়া হয়।
নিহত সাদিকের চাচাতো ভাবি দিপা আক্তার জানান, সাদিক ৪০/৫০ ফুট পানির নিচে সফলতার সাথে অভিযান পরিচালনা করেছে। কয়েকদিন আগেও পদ্মা সেতু এলাকায় অনেক গভীর পানির নিচ থেকে ৫দিন আগের মারা যাওয়া ব্যাক্তির লাশ তুলেছে। সেই ভিডিও আমাকে পাঠিয়েছে। এত বড় একজন সফল ডুবুরি দিয়ে কেন কচুরিপানা পরিষ্কার করানো হলো। আর এই সামন্য পানিতে কিভাবে তার মৃত্যু হলো আমরা মেলাতে পারছি না। ঘটনার পেছনে কিছু থাকলে তা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও সাদিকের নিকট প্রতিবেশী মো. ফজলুল হক জানান, সাদিকের মতো ভদ্র, বিনয়ী ও সাহসী ছেলে এই অঞ্চলে খুব কমই আছে। সাদিকের বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত অসুস্থ্য একজন মানুষ। তারা দুই ভাই দুই বোন। তার ভাই পুরোপুরি বেকার, এক বোনের বিয়ে হয়েছে। সাদিকের বাবা বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি মুদির দোকান করে। তার তেমন একটা আয়-রোজগার নেই। মূলত সাদিকের আয়েই চলতো তাঁদের সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল সাদিক। এসময় তিনি নিহত সাদিকের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানান।
মন্তব্য করুন