সারাদেশে অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে এই সমন্বিত শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে সারাদেশে প্রায় ৫ হাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে লাইসেন্সবিহীন ও গুরুতর অনিয়মের দায়ে ২৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে এবং ২০০ প্রতিষ্ঠানকে শর্ত সংশোধনের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডা. মো. নুরুল ইসলাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) শাখার পরিচালক হিসেবে যোগদান করার পর থেকেই সারাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তার কঠোর নির্দেশনা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের ফলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলো এখন অনেকটাই দালালমুক্ত। আগে যেখানে রোগীরা গেটেই দালালদের হয়রানিতে অতিষ্ঠ ছিলেন, এখন তারা কোনো হয়রানি ছাড়াই সরাসরি টিকিট কেটে সেবা পাচ্ছেন। তার নির্দেশনায় অফিস টাইমে চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি, ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগ চালু, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড এবং সরকারি ওষুধের সঠিক বিতরণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সারাদেশে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। আমরা শুধু অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করছি না, আমরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান বাড়ানোর জন্য সমানভাবে কাজ করছি। আমার স্পষ্ট নির্দেশনা হলো দেশের কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো দালাল থাকবে না, কোনো রোগী হয়রানির শিকার হবে না। আমি প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আমার লক্ষ্য একটাই গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই মানসম্মত, হয়রানিমুক্ত ও মানবিক চিকিৎসা সেবা পান। কোনো রোগীকে যেন আর চিকিৎসার জন্য বেসরকারি ক্লিনিকে দৌড়াতে না হয়। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয়ের দিকনির্দেশনায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। অভিযানে শুধু সিলগালাই নয়, মালিক ও ভুয়া চিকিৎসকদের কারাদণ্ডও দেওয়া হচ্ছে। প্রথম দফায় ঢাকার আশুলিয়ায় ৬টি প্রতিষ্ঠানের প্যাথলজি বিভাগ, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ৭টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মানিকগঞ্জের সিংগাইর ও পৌর এলাকায় ৫টি, খুলনায় ৫টি এবং রাজধানীর পল্টনে অনুমোদন ছাড়া বিদেশগামী কর্মীদের মেডিকেল করা হিউম্যান ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টারসহ সারাদেশে ৮৮টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়।
খুলনা বিভাগে পাইকগাছার বাঁকা সার্জিক্যাল ক্লিনিকের মালিক গৌতম সরকারকে ভুয়া চিকিৎসক সেজে রোগী দেখার দায়ে ২১ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং বটিয়াঘাটায় ডিজিটাল ক্লিনিকের মালিক সৌরভ মন্ডলকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৩০ দিনের জেল দিয়ে ক্লিনিক সিলগালা করা হয়। এছাড়া ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ‘আমাদের হাসপাতালে’ সনদবিহীন চিকিৎসক শরিফুল ইসলামকে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা, ঝিনাইদহ ও গোপালগঞ্জে ভুয়া ডাক্তার রেজাউল করিমকে ৩ মাসের জেল ও ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং ময়মনসিংহ নগরীতে ৩টি প্রতিষ্ঠানের ৩ জনকে ৭ থেকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর পুঠিয়ায় ফাতেমা ক্লিনিক ও নিরাময় ক্লিনিককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং রিজিয়া ক্লিনিক ও গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট সেবা ক্লিনিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দালাল চক্রের ৭ সদস্যকে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। নাটোর জেলায় লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান গুলোর তালিকা তৈরিসহ যাচাই-বাছাই চলমান রয়েছে।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার মাননীয় পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম স্যার আমাদেরকে সুস্পষ্ট ভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন যে, উপজেলার কোন অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কোন ভাবেই ছাড় পাবে না এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা কোনো রোগী যেন দালাল দ্বারা হয়রানির শিকার না হয় এবং অফিস টাইম অনুযায়ী ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালে কর্মরত সকল কর্মকর্তাদের সময় মত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত তদারকি করছি।
বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. সাইয়েদুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মহোদয়ের নির্দেশনায় বরিশাল জেলায় অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা জেলার সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও জনবলের বৈধতা যাচাই শুরু করেছি। তিনি আরও বলেন, লাইসেন্সবিহীন এবং সরকারি হাসপাতালের আশেপাশে গড়ে ওঠা কোনো অবৈধ ক্লিনিককে কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। রোগীদের স্বার্থে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এই তদারকি অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা নয়, বৈধ প্রতিষ্ঠান গুলোর সেবার মান বৃদ্ধি করা এবং সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গুলোকে জনবান্ধব করা। তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে চিকিৎসক উপস্থিতি, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, ওষুধ সরবরাহ এবং রোগীদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে আমরা কঠোর মনিটরিং করছি। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মন্তব্য করুন