দু’টি কারণে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ মাদকের চারণভূমি হিসেবে উপযুক্ত স্থান। একটি হলো দেশের বৃহত্তম যৌনপল্লী এখানে অবস্থিত, অপর কারণটি হলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। এরই প্রেক্ষিতে গোয়ালন্দ উপজেলার একটি পৌর শহর ও চারটি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই ভায়াবহ ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। প্রায় প্রতিটি গ্রাম-মহল্লায় হাত বাড়ালেই সহজেই মিলছে হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, মদ, গাঁজাসহ নানা মাদক।
বাস্তবতা বিবেচনা করে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর মাদক নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্বের ঘোষণা দেন এই এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈময়। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী গত ১৩ মার্চ গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে মতবিনিময় সভায় মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারন করেন। তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের ৭ দিনের আল্টিমেটাম দেন। এরমধ্যে তারা যদি মাদক ব্যবসা থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হবে। সভায় রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা সভায় উপাস্থান করলে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের উদ্দেশে বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয় না, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে মাদক সেবনকারীদের। এটা মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভুমিকা রাখছে না।’ প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের কথা এলাকায় বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর এই আলটিমেটামের খুব একটা প্রভাব এলাকায় লক্ষ্য করা য়ায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাট রেলস্টেশনের পাশে অবস্থিত। সেখানে কয়েক হাজার যৌনকর্মীর বসবাস। ওই পল্লীর বেশির ভাগ যৌনকর্মী, বাড়িওয়ালা মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। যৌন ব্যবসার পাশাপাশি তারা পল্লীর খদ্দেরদের মধ্যে বিভিন্ন মাদক বিক্রি করেন। পাশাপাশি ওই পল্লীতে রয়েছে শতাধিক অবৈধ মদের দোকান। এছাড়া যৌনপল্লীকে কেন্দ্র করে দৌলতদিয়া বাজার ও রেলস্টেশন এলাকায় রয়েছে শতাধিক আবাসিক বোর্ডিং। বোর্ডিং ব্যবসার আড়ালে বেশির ভাগ বোর্ডিংয়ের ভেতরে নিয়মিত মাদক সেবন ও জুয়া খেলার আসর বসে।
গোয়ালন্দে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু নেতার ছত্রচ্ছায়ায় চলে মাদকের কারবার। ক্ষমতার পালাবদল হয়, তবে দ্রুত সময়ের মধ্যেই মাদক ব্যাবসায়ীরা ভিড়ে নতুন ক্ষমতার ছায়াতলে। গত ২৯ এপ্রিল দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে মাদকের ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গোয়ালন্দ উপজেলা শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি সুমন মোল্লাকে দলীয় সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর আগে তাঁর মাদক ব্যবসার কথা স্বীকার করার কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় দলের পক্ষ থেকে। এছাড়া স্থানীয় কয়েকজন সাবেক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় দৌলতদিয়া যৌনপল্লী, পোড়াভিটাসহ উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ সকল অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যাক্তিরা বেশীর ভাগই মাদক সেবী কিংবা ছোট-খাটো খুচরা মাদক বিক্রেতা। কিন্তু সব সময় আড়ালেই থেকে যায় মাদকের পাইকার কারবারিরা।
তথ্যানুসন্ধানে মাদক ব্যবসায় জড়িত বেশ কিছু নাম সামনে আসে। যেমন, দৌলতদিয়া পুড়াভিটা এলাকায় মাদকের বড় ব্যবসায়ীরা হলো, রোজি বেগম, সাথী, লাইলী, মৌসুমি, শাহানাজ, পাতা বেগম, সুমন, জাহাঙ্গীর, আজিজ প্রামাণিক। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে।
গোয়ালন্দ পৌর শহরের আড়তপট্টি এলাকায় সরকার অনুমোদিত মেসার্স রণজিৎ সরকার নামের একটি দেশি মদের দোকান রয়েছে। বর্তমানে ওই দোকানে অনুমোদিত ক্রেতার সংখ্যা ৩০০ জন। অনুমোদিত কার্ডধারী ক্রেতার বাইরে অন্য কারো কাছে দেশি মদ বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিধি অনুযায়ী প্রতি মাসে কার্ড প্রতি ৯ লিটার ৭৫০ গ্রাম করে মদ দেওয়ার কথা। কিন্তু ওই দোকান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমান দেশি মদ অবৈধ ভাবে অনুমোদিত ক্রেতার বাইরে বিক্রি হয়। এছাড়া এখান থেকে অবৈধ উপায়ে পাচার হওয়া মদের উপর ভিত্তি করে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠেছে শতাধিক মদের দোকান।
অবস্থান বিবেচনায় গোয়ালন্দে মাদকের ভয়াবহতা রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কথা বরাবর বলা হলেও তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাসে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় মাত্র ১২টি মাদক মামলা রুজু হয়েছে। এরপর গত এপ্রিল মাসে তা আরো কমে ১০ টি মামলা রুজু হয়।
মাদকের আগ্রাসনে গত ১১ এপ্রিল মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের ক্ষুদিরাম সরকারের পাড়া এলাকায় মাদকের টাকা না দেওয়ায় ছেলে গোবিন্দ ঘোষ এলোপাথাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে মা শিখা রানী ঘোষকে (৪০)।
মাদকের ছড়াছড়িতে এলাকায় সাধারন মানুষদের স্বাভাবিক জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তাদের সন্তানদের নিয়ে সারাক্ষন এক ধরনের আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে অভিজাত পরিবারের স্কুল, কলেজ পড়ুয়া সন্তানরা অভিভাবকদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত মাদক বাণিজ্য অচিরেই নিয়ন্ত্রণ না হলে, এই এলাকার আগামী প্রজন্ম চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সফিকুল ইসলাম জানান, মাদকের বিস্তার বাড়া বা কমার কোন প্যারামিটার নেই। এটা যে যেভাবে পর্যবেক্ষন করে সেটাই তার কাছে প্রতিয়মান হয়। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে গাঁজা ও হেরোইন উদ্ধারসহ ৩টি মামলা হয়েছে। এসময় তিনি দাবি করে বলেন, ‘দৌলতদিয়া যৌনপল্লী ছাড়া উপজেলার অন্যান্য এলাকায় বর্তমানে মাদক বেচা-কেনা জিরো পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। যৌনপল্লী এলাকায়ও অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে মাদক নিয়ন্ত্রণে আছে।’ সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর আল্টিমেটাম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এগুলো আপেক্ষিক কথা।
মন্তব্য করুন