আইন অঙ্গন সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি শুনেছি, বা নিজে অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছি। আজকে বাংলাদেশের অধস্তন আদালত বা জেলা পর্যায়ের আদালতগুলো নিয়ে কিছু সাধারণ ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করব।
অধস্তন আদালতগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়ঃ (১) দেওয়ানি ও (২) ফৌজদারি। দেওয়ানি আদালতে সাধারণ অর্থে জমি-জমা বিষয়ক মামলা বা কোনো প্রকার দাবির মামলা দায়ের করা হয় এবং ফৌজদারি আদালতে জমিজমা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যেমন মারামারি, খুন, জখম, ধর্ষণ ইত্যাদি বিষয়ক মামলা দায়ের করা হয়। একটি জেলায় বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদধারী বিচারক হলেন জেলা ও দায়রা জজ।
নিচে ক্রম অনুসারে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত গুলো দেখানো হলঃ
দেওয়ানি আদালত (Civil Court)
জেলা জজ আদালত
↑
অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত
↑
যুগ্ম জেলা জজ আদালত
↑
সিনিয়র সহকারী জজ আদালত / সহকারী জজ আদালত
দেওয়ানি আদালতে প্রতিটি থানার দায়িত্বে একজন সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজ থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই এই সব আদালত গুলো পারিবারিক আদালত হিসেবেও কার্য সম্পাদন করে থাকেন। অর্থাৎ দেনমোহর, তালাক, ভরণপোষণ, বাচ্চার কাস্টডি/হেফাজত ইত্যাদি মামলাও সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজ আদালতেই দায়ের করতে হয়।
বর্তমানে একজন সিনিয়র সহকারী জজের আর্থিক এখতিয়ার ২৫ লক্ষ টাকা মূল্যমান পর্যন্ত, অর্থাৎ অনধিক ২৫ লক্ষ টাকা মূল্যের সম্পত্তি নিয়ে মামলা হলে তা সিনিয়র সহকারী জজ বিচার করবেন। সহকারী জজের আর্থিক এখতিয়ার ১৫ লক্ষ টাকা মূল্যমান পর্যন্ত, অর্থাৎ অনধিক ১৫ লক্ষ টাকা মূল্যের সম্পত্তি নিয়ে মামলা হলে তা সহকারী জজ বিচার করবেন। ২৫ লক্ষাধিক টাকার অধিক মূল্যের সম্পত্তি নিয়ে মামলা করতে হলে যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করতে হবে।
দেওয়ানি আদালতের থেকে ফৌজদারি আদালতগুলো কিছুটা ভিন্ন কেননা বিদ্যমান ব্যবস্থায় অধস্তন আদালতে দুই শ্রেণির ফৌজদারি আদালত রয়েছেঃ-
১। দায়রা জজ আদালত এবং ২। ম্যাাজিস্ট্রেট আদালত।
সাধারণভাবে বলা যায় অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধগুলোর বিচার হয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এবং অপেক্ষাকৃত গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার হয় দায়রা জজ আদালতে বা সেশন কোর্টে।
নিচে ছক আকারে দায়রা জজ আদালতের ক্রমবিন্যাস দেখানো হল ঃ
দায়রা জজ আদালত
↑
অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত
↑
যুগ্ম দায়রা জজ আদালত
মজার বিষয় হচ্ছে দায়রা আদালতে সরাসরি কখনো মামলা দায়ের করা যায় না। বলা যায় (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) অপরাধ সম্পর্কিত ৯৫ ভাগ (শতকরা হিসেবে) মামলাই আসে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। দেশের প্রতিটি থানার দায়িত্বে একজন করে কগনিজেন্স / আমলী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকেন।
নিচে ছক আকারে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ক্রমবিন্যাস দেখানো হলঃ
চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত
↑
অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত
↑
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট / জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত
এখানে উল্লেখ্য যে, যেসব এলাকায় মেট্রোপলিটন রয়েছে, সেসব এলাকায় ফৌজদারি আদালতে আরও দুই ধরনের আদালত যুক্ত হয়, (১) মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং (২) চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
এই দুই শ্রেণির আদালতের ক্রমবিন্যাস হবে যথাক্রমে দায়রা জজ আদালত এবং চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-এর মত। অর্থাৎ মেট্রোপলিটন এলাকার মামলাগুলো নিয়ে এই দুই শ্রেণির আদালতগুলো কাজ করে থাকে। মেট্রোপলিটন বাদে জেলার অন্যান্য স্থানের মামলাগুলো নিয়ে দায়রা জজ আদালত এবং চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কাজ করে থাকে।
এছাড়া একটি জেলায় বিশেষ কিছু ট্রাইব্যুনাল থাকে যেখানে সুনির্দিষ্ট ভাবে কিছু মামলা গ্রহণ করা হয় এবং বিচার করা হয় যেমনঃ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, শিশু আদালত, মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, সাইবার ট্রাইব্যুনাল ইত্যাদি।
লেখকঃ
ফারিহা নোশীন বর্ণী, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মানিকগঞ্জ জেলা।

মন্তব্য করুন