স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা পাল্টাচ্ছে না কেন? দোষ কি ডাক্তারের? - Rajbari
ডা. রাজীব দে সরকার
২৪ জুন ২০২৫, ১:৫১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা পাল্টাচ্ছে না কেন? দোষ কি ডাক্তারের?

ডাঃ রাজীব দে সরকার
সার্জারী বিশেষজ্ঞ। কলামিস্ট।

“সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে” কিন্তু এক রমণী অন্য রমণীর সংসারে সুখ বয়ে আনতে পারেন কি? পারলেও কতোটুকু!!  স্বাস্থ্যখাতে প্রকৃত পরিবর্তন ও সংস্কার অন্য গোত্রের মানুষ দিয়ে আসলেই কি সম্ভব? হলেও বা কতোটুকু?

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে The Code of Criminal Procedure 1898 এর বিশেষ ২ টি ধারার মাধ্যমে আমাদের সেনাবাহিনির কমিশন্ড অফিসারদের ২ মাসের জন্য স্পেশাল এক্সেকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেসী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে করে উদ্ভূত আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যেহেতু সকল খাতের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এর বিষয়টিও সামনে এসেছে, আমার ১০ বছর আগের একটি কলামকে আবারো নতুন করে লেখার প্রয়োজন মনে করলাম।

বিসিএস এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন নবীন চিকিৎসক যখন ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা দিতে যান, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রচলিত সিস্টেম তখন তাকে সিস্টেমে নিয়ে আসতে চেষ্টা করে। ইচ্ছা সত্তেও স্বাস্থ্যখাতের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা সম্ভব হয় না এই বিসিএস কর্মকর্তার।

অথচ প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে তার একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা সহকারী সচিব এর সমান ক্ষমতা ও দায়িত্বপ্রাপ্তির কথা ছিলো। কিন্তু শুধু আউটডোরে বসে প্যারাসিটামল, মেট্রো আর গ্যাসের বড়ি লিখেই একজন নবীন সরকারী কর্মকর্তার মেধা, মনন ও শ্রমের অপচয় করা হয়।এটাই সিস্টেম। অথচ দেশকে দেবার ছিলো তার অনেক কিছুই।

একটু পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন।

আমাদের অনেকেরই জানা যে উপজেলা বা গ্রাম পর্যায়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য অনিরাপদে পড়ে থাকে কোয়াক এবং ফার্মেসীর দোকানদারদের হাতে।

অ্যান্টিবায়োটিক, দামী স্যালাইন, ব্যাথানাশক, স্টেরয়েড এর যথেচ্ছ ব্যবহার, যেন তেন করে ক্ষত সেলাই, দুঃসাহসিক শল্যচিকিৎসা, অসংক্রামক রোগের অযাচিত চিকিৎসা/অপচিকিৎসা, সংক্রামক রোগের অপূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ইত্যাদি করে গ্রামের মানুষের ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকির অবস্থা তৈরী হয়েছে বহু বছর ধরে। অথচ কেউই এর প্রতিকার বিধানের কোন প্রচেষ্টা করেনি। এদের অপচিকিৎসার কি কখনো বিচার হয়েছে? কখনোই না।

আবার একজন গরীব অসুস্থা মানুষ উপজেলা হাসপাতালে, ইউনিয়ন সাবসেন্টারে বা কমিউনিটি ক্লিনিকে গেলেন সেবা নিতে। কিন্তু তিনি প্রত্যাশিত সেবা পেলেন না। হয় তার সাথে স্বাস্থ্যকর্মী বা সেবিকারা দুর্ব্যবহার করলেন, কিংবা যেকোন সেবার জন্য তার কাছ থেকে প্রয়োজনের বেশী মূল্য নেওয়া হলো, অথবা অ্যাম্বুলেন্স এর চালক রোগী নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালো – অব্যবস্থাপনা যেটাই হোক না কেন ভুক্তভোগী কিন্তু কোন বিচার পান না।

চিকিৎসকেরা এ সময় অসহায় অনুভব করেন। কারন তিনি একজন সাধারণ ক্ষমতাহীন মেডিকেল অফিসার। কেউ তার আদেশ না শুনলে বিধিমালা যাই বলুক প্র্যাকটিকালি তার কিছুই করার নেই। কারন কর্মচারীরা তাদের কাজের জন্য ব্যবহারিক অর্থে কেবল একজন ইউএইচএফপিও কিংবা সিভিল সার্জনের কাছে দায়বদ্ধ।

আর এই সব তথাকথিত প্রশাসনিক পদের আসীন আমাদের স্যাররা এতো দায়িত্বে জর্জরিত থাকেন যে এসব বিচার-জবাবদিহিতার লোড তারা নিতে চান না। আর একজন কর্মচারীর এসিআর (বাৎষরিক গোপনীয় প্রতিবেদন) এ স্বাক্ষর করেন তারাই। কর্মচারীরা চিকিৎসকদের খুব একটা তোয়াক্কা করার কথা মনে করেন না। তাই কোন কর্মচারীর অন্যায়কে সহ্য করে নেওয়া ছাড়া একজন সরকারী চিকিৎসক এর আর কিছুই করার থাকে না।

দিন শেষে যা হয় তা হলো নবীন একজন চিকিৎসক যিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অনেক খানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন, নিজেই ট্রেডিশনের পুতুলে পরিণত হন। এক সময় তিনি উপজেলা লেভেল ছেড়ে পোস্টগ্রাজুয়েশন বা অন্যান্য কারনে জেলা পর্যায়ে বদলী হন। ফলে অপচিকিৎসা আর অব্যবস্থাপনার আকড় হয়ে পড়ে থাকে উপজেলা/ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যখাত। বছরের পর বছরে ধরে এভাবেই চলে এসেছে। এই অন্ধকার কাটেনি আজো।

অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে উপজেলা পর্যায়ে একজন চিকিৎসককে আর “নিধিরাম সর্দার’ করে রাখা চলবে না।

“মেডিকেল অফিসার” পদবীর পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়ে একজন সরকারী চিকিৎসকের পদের নাম করতে হবে “উপজেলা চিকিৎসা কর্মকর্তা নির্বাহী স্বাস্থ্য ম্যাজিস্ট্রেট” (Upazila Medical Officer and Executive Health Magistrate)

কেবল চিকিৎসা প্রদান করার জন্য সরকার একজন চিকিৎসককে উপজেলা পর্যায়ে পাঠাননি। চিকিৎসা প্রদানের সাথে সাথে জনগণের স্বাস্থ্যখাতের সাথে জড়িত প্রতিটি বিষয়ে তিনি তদারকি করার ক্ষমতা রাখবেন। চিকিৎসার সাথে জড়িত ধাপগুলোর অনিয়ন-দুর্নীতি প্রতিকারে তিনি প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে ও দন্ড দিতে পারবেন। তাকে ইউএইচএফপিও কিংবা সিভিল সার্জনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। এই ম্যাজিস্ট্রেসী ক্ষমতা প্রতিবিধানে সরাসরি ইউএনও মহোদয় ও স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের ওসি তাকে সহযোগিতা করবেন।

দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়, কিছু কিছু পরীক্ষা হলে পরিদর্শককেও ম্যাজিস্ট্রেসী ক্ষমতা দেওয়া হয়। অথচ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের মতো এতো সংবেদনশীল একটি সেক্টর আমরা প্রায় সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে চলেছি।

১৮৯৭ সালে প্রণীত ‘GENERAL CLAUSES ACT 1897’ অনুযায়ী ফৌজদারী আইন সম্পর্কে জানা ও তার প্রয়োগের ক্ষমতাই ম্যাজিস্ট্রেসী। এই দায়িত্ব মেডিকেল সায়েন্সে অভিজ্ঞ একজন সরকারী চিকিৎসকের হাতে পৌছালেই তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কোন চিকিৎসক যদি কোন কারনে এই অর্পিত দায়িত্ব নিতে না চান তবে তিনি তা সারেন্ডার করতে পারবেন। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে একাধিক নির্বাহী স্বাস্থ্য ম্যাজিস্ট্রেট থাকতে হবে।

আমার ঘরের কোথায় ডিফেক্ট আমিই ভালো জানবো। বাইরের মানুষ বা অন্য ঘরের মানুষ এসে আমার ঘরের সমস্যা ঠিক করে দিয়ে যেতে পারবে না। ইচ্ছাশক্তি ও বিচক্ষণতা দিয়ে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যখাতে বিপ্লব ঘটাতে পারেন তরুণ চিকিৎসক কর্মকর্তারা। আসুন এই বৃহৎ ক্যাডারের ঐক্য ও প্রতিভাকে দেশের কাজে নিয়োজিত করার প্রয়াস নিই।

জয়তু বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজ।

লেখক-

ডাঃ রাজীব দে সরকার
সার্জারী বিশেষজ্ঞ। কলামিস্ট ও প্রকাশক, রাজবাড়ীবিডি.কম।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘ফুলে ফুলে যেন ভুল না হয়ে যায়’ – সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী খৈয়ম

কালুখালীতে রাতের আঁধারে কৃষকের ফসল তুলে নষ্ট করলো দুর্বৃত্তরা

পাংশায় ৪ মাদকসেবীকে ৪৫ দিনের কারাদণ্ড, টাপেন্টাডলসহ গ্রেফতার ২

গোয়ালন্দে মাদকসহ ৪জন গ্রেপ্তার

রাজবাড়ীতে ট্রাক-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রবাসী নিহত

পাংশায় পূর্ব শত্রুতার জেরে তিনজনকে কুপিয়ে জখম

‘প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ -সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

রাজবাড়ীতে মাদকাসক্তের লাঠিপেটায় বৃদ্ধ নিহত

রাজবাড়ীতে চাঞ্চল্যকর কৃষক হত্যা মামলায় ৬ আসামি গ্রেপ্তার

পাংশায় তরুণীকে ডেকে এনে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ

১০

রাজবাড়ী‌তে দুইটি বি‌দেশী পিস্তল, ৪ টি ম‌্যাগা‌জিন ও ৮ রাউন্ড গু‌লিসহ যুবক আটক

১১

পাংশায় জামায়াতে ইসলামীর আয়োজনে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত 

১২

রাজবাড়ীতে ছয় মাদকসেবীর কারাদণ্ড

১৩

দেশকে সমৃদ্ধ ও কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবো —সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

১৪

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের উদ্বোধন করলেন এমপি হারুন অর রশিদ 

১৫

গোয়ালন্দ প্রেসক্লাবে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ইফতার

১৬

পাংশায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে রাতের আধারে আবারও ব্যানার  

১৭

গোয়ালন্দে গণ অধিকার পরিষদের ইফতার মাহফিল

১৮

কালুখালী প্রেসক্লাবের আয়োজনে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

১৯

মতাদর্শের ভিন্নতাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য -হারুন-অর-রশিদ এমপি

২০