রাজবাড়ীর কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করানো চটপটি বিক্রেতা মুন্নু শেখকে সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে উপজেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেজবাহ উদ্দিন তাঁর কার্যালয়ে মুন্নু শেখের হাতে এ আর্থিক সহায়তা ও সম্মাননা তুলে দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গনমাধ্যম সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটপটি বিক্রেতা মুন্নু শেখের ব্যতিক্রমি মানবিক উদ্যোগ পানি পান করানোর বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে আসে কালুখালী উপজেলা প্রশাসনের । মুন্নু শেখের নিঃস্বার্থ মানবসেবায় মুগ্ধ হয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। মুন্নু শেখ রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের মোবারক শেখের ছেলে।
প্রতিদিন দুপুরে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন রাজবাড়ীর কালুখালী রেলস্টেশনে থামতেই শোনা যায় “টাকা ছাড়া ঠান্ডা পানি… টাকা ছাড়া কলের ঠান্ডা পানি”। প্রথম দেখায় যে কেউ তাকে হকার ভাববেন, কিন্তু না তিনি আসলে একজন হতভাগ্য বাবা। দূরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারে ১০ বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখকে হারিয়ে গত ৪ বছর ধরে এভাবে ট্রেনের তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করিয়ে হারানো সন্তানকে খুঁজে পান মুন্নু শেখ। পেশায় তিনি একজন চটপটি বিক্রেতা হলেও যাত্রীদের তৃষ্না মেটাতে দুপুরে ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌছানোর আগেই দোকান বন্ধ করে বালতিতে পানি নিয়ে হাজির হন প্লাটফর্মে। এবং ট্রেন থামা মাত্রই তৃষ্নার্থ যাত্রীদের হাতে তুলে দেন ঠান্ডা পানির বোতল। বিনিময় চান শুধু দোয়া ও ভালবাসা। যতদিন সুস্থ্য থাকবেন ততদিন এভাবেই যাত্রীদের পানি পান করাতে চান মুন্নু শেখ। এদিকে মুন্নু শেখের এই ব্যাতিক্রমী উদ্দ্যোগ ও এই নিঃস্বার্থ ভালবাসায় মুগ্ধ ট্রেনের যাত্রী ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ সহ স্থানীয়রা।
২০১৮ সালে মুন্নু শেখের ১০ বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। তখন ছেলেকে চিকিৎসা করাতে নিয়মিত এই ট্রেনে করে তিনি খুলনা থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাতায়াত করতেন। চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে অনেক সময় অসুস্থ ছেলেকে এক বোতল পানি কিনে দেবার মত টাকা থাকতো না তার পকেটে । দীর্ঘ লড়াই শেষে ক্যান্সারের কাছে হার মেনে ২০২০ সালে না ফেরার দেশে চলে যায় সবুজ। সন্তানের মৃত্যুতে মুন্নু শেখকে ভেঙে পড়েলেও দমে যান নাই। তিনি তখন প্রতিজ্ঞা করেন যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন নকশিকাঁথা ট্রেনের কোনো তৃষ্ণার্ত যাত্রীকে পানির কষ্ট পেতে দেবেন না। সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে প্রায় ৪ বছর তিনি প্রতিদিন কালুখালী স্টেশনে থামার পর নকশিকাঁথা মেইল ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি করাচ্ছেন।
কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “মুন্নু শেখের মতো মানুষ সমাজের জন্য অনুকরণীয়। তিনি কোনো স্বার্থের জন্য নয়, শুধুমাত্র মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁর এই মহৎ উদ্যোগকে সম্মান জানাতেই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামান্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষও যদি তাঁর পাশে দাঁড়ান, তাহলে তিনি আরও ভালোভাবে এই মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেন।”
মন্তব্য করুন