অনিয়ম, দুর্ণীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার আখড়া গোয়ালন্দের বিদ্যুত অফিস - Rajbari
রাজবাড়ী বিডি ডেস্ক
২৬ অগাস্ট ২০২৬, ২:২১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

অনিয়ম, দুর্ণীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার আখড়া গোয়ালন্দের বিদ্যুত অফিস

অনিয়ম, দুর্ণীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার মহোৎসব চলছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ওয়েস্টার্ন জোন পাওয়ার ডিসট্রিভিউশন কোম্পানী লিঃ (ওজোপাডিকো) এর অফিসে। এতেকরে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিদ্যুতের গ্রাহকরা।

গ্রাহকদের মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, আবাসিক সংযোগকে বানিজ্যিক আবার বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক সংযোগ, নতুন সংযোগ দিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ নানা ধরনের অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য উঠে আসে অনুসন্ধানে। ওজোপাডিকে গোয়ালন্দ অফিসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন গ্রাহকদের তথ্য ও অন্যান্য তথ্য চাইলেও দিনের পর দিন ঘুরিয়ে বিভিন্ন টালবাহনা করে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি করেন কার্যালয়ের আবসিক প্রকৌশলী।

গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুন পাড়া গ্রামের প্রবাসী আব্দুল কাদেররে স্ত্রী রেহেনা খাতুনের সাথে কথা হয়। তিনি চোখের পানি ফেলে বলেন, ‘আমার স্বামী প্রবাসে থাকেন। আমি সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে থাকি। আমার বাড়িতে নিয়মিত যে বিদ্যুত বিল আসতো তা হঠাৎ করে কিছুটা কমে যায়। বিষয়টি আমি বিল রিডার ও লাইনম্যানদের জানাই। কিন্তু তারা মিটার দেখে বলেন, মিটার ঠিক আছে, সমস্যা নেই। এরই মাঝে হঠাৎ একদিন তার ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক মিটার বিদ্যুত বিভাগের লোকজন খুলে নিয়ে তাকে অফিসে যেতে বলে চলে যায়।’ তিনি কোন উপায়অন্ত না পেয়ে দ্রুত চলে যান বিদ্যুত অফিসে। অফিস থেকে তাকে বিদ্যুত চোর বলে চরম ভাবে অপমান করা হয় এবং বলা হয়, ‘আপনার মিটারে সমস্যা আছে, দ্রুত ১ লাখ টাকা না দিলে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। সেই সাথে বিষয়টি কারো সাথে আলাপ করা যাবে না।’ এসময় তিনি কান্নাকাটি করে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে মামলা থেকে রেহাই পান। এ টাকার বিপরীতে তাকে কোন ভাউচার/স্লীপ দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রেহেনা খাতুন বলেন, ‘না আমাকে কোন রশিদ বা কোন প্রকার কাগজপত্র দেয় নাই।’

উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব তেনাপচা গ্রামের আব্দুল জলিল ফকির বলেন, ‘বিদ্যুত বিভাগের লোকজন আকষ্মিক ভাবে আমার বাড়িতে আসে।’ এসময় তারা বলেন, ‘আপনার বাড়ির মিটারে সমস্যা আছে, বিল কম উঠে।’ আমি তাদের বলি, ‘ ঠিক আছে, আমার মিটারে যদি কোন সমস্যা থাকে তবে আপনারা অন্য মিটার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন।’ তারা একাধিক মিটার দিয়ে পরীক্ষা করলেও আমার মিটারে কোন সমস্যা ধরা পরে নাই। এরপর তারা আমার কোন কথা না শুনে আমার মিটার বিকলের অযুহাতে আমাকে মামলার ভয় দেখিয়ে ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে। পড়ে আমি বাধ্য হয়ে তাদেরকে ১ লাখ টাকা দেই এবং আরো ১০ হাজার টাকা দেই নতুন প্রিপেইড মিটার লাগানোর জন্য।

গত ২২ জুলাই নিজ দোকানেই কথা হয় গোয়ালন্দ পৌরজামতলা বাজারের ছোট্ট খাবারের দোকানী আবুল কালামের সাথে। তিনি বলেন,  ‘বিদ্যুতের কর্মচারীরা আমার দোকানে খেয়ে ঠিকমত টাকা দিত না। এ নিয়ে আমি একটু বাগবিতান্ডা করায় তারা উদ্দেশ্যমূলক ভাবে আমার বাড়ির সংযোগ আবাসিক থেকে বানিজ্যিক করে দেয়। আগে যেখানে ৬/৭শ টাকা বিল আসতো, এখন আমার বিল আসে ৩ হাজার টাকার উপরে। দীর্ঘদিন অফিসে ঘুরেও এখনো পর্যন্ত আমি তা আবাসিক করতে পারিনি।’

নিয়ম অনুযায়ী খাম্বার সাথে কোন মিটার লাগানোর সুযোগ না থাকলেও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ বিদ্যুত অফিসের সামনেই চোখে পড়ে একটি বৈদ্যুতিক খাম্বার সাথে ঝুলছে একটি সংযোগ মিটার। গত ৩০ জুলাই সেই মিটার থেকে বিদ্যুত লাইন অনুসরন করে এগিয়ে যেতেই দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ফসলের মাঠের ভেতর দিয়ে চরম ঝুকিপূর্ণ ভাবে অন্তত ২ হাজার মিটার দুরে একটি মুরগীর ফার্মে ওই বিদ্যুতের সংযোগ। ওই মুরগীর ফার্মে গিয়ে দেখা হয় ফার্মের মানিক সুমন মোল্লার সাথে। তিনি জানান, পূবে তিনি পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়েছিলেন। সে সময় তার বিদ্যুত বিল আসতো ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। বর্তমানে তিনি ওজোপাডিকোর বিদ্যুত লাইন ব্যবহার করেন। বিল আসে মাত্র ৫/৬শ টাকা। এসময় বিল কি তিনি নিজে দেন নাকি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘২/৩ মাস পরপর বিদ্যুত অফিসের লোক এসে বিল নিয়ে যান।’ তার কাছে একটি বিদ্যুত বিলের কাগজ দেখতে চাইলে তিনি একটি বিলের কাগজ দেখান। তাতে দেখা যায় তার সংযোগটি আবাসিক হিসেবে দেয়া হয়েছে। অথচ তিনি বানিজ্যিক ভাবে বিদ্যুত ব্যবহার করছেন।

এসময় সুমন মোল্লাকে চরম ঝুকিপূর্ণ ভাবে বে-আইনী ভাবে এত দুরে বিদ্যুতের লাইন এসেছেন কেন? যে কোন সময় দূর্ঘটনায় কোন কৃষক বিদ্যুতায়িত হওয়ার ঝুকি প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমার লাইনটি বর্তমানে ঝুকিপূর্ণ আছে, তবে আমি দু’এক দিনের মধ্যে বাঁশ দিয়ে উচু করে বিদ্যুত লাইন ঝুকিমুক্ত করে দেব।’

গোয়ালন্দ পৌরসভার ইবাদউল্লাহ মিস্ত্রির পাড়ার নয়ম শেখ, উজানচর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের প্রবাসীর স্ত্রী রেখা খাতুন, ময়ছের মাতব্বার পাড়ার মো. রবিউল ইসলাম, কাইমদ্দিন মাতুব্বার পাড়ার দেলোয়ার সেকসহ বেশ কয়েকজন নতুন সংযোগ গ্রহনকারী গ্রাহকের সাথে কথা হয়। তারা জানান, তাদের নতুন বিদ্যুত সংযোগ নিতে প্রত্যেকের কাছ থেকে বিদ্যুত বিভাগকে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা দিকে হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওজোপাডিকো গোয়ালন্দ অফিস থেকে ৩৪৮ টি নতুন সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি সংযোগে নির্ধারিত ফি ২ হাজার ৬শ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা। কিন্তু এ সব সংযোগ দিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের মাধ্যমে বিদ্যুত বিভাগের সিন্ডিকেট বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। নির্ধারিত ফিতে একটি সংযোগও কোন গ্রাহক পায়নি। আবার নিয়ম বহির্ভূত ভাবে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঝুকিপূর্ণ ভাবে পোল থেকে অনেক দুরত্বে সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।

ওজোপাডিকো’র গোয়ালন্দ কার্যালয়ের আবাসিক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তোফাজ্জল হোসেন ৩০ জুলাই সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘প্রতিটি নতুন সংযোগে নির্ধারিত ফি ২ হাজার ৬শ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা। এর বেশী টাকা নেয়ার সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।’ এসময় তার বিরুদ্ধেও এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোন অনিয়মের সাথে জড়িত থাকলে আমার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবে।’

এ সকল অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে রাজবাড়ী ওজোপাডিকো’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন অর রশিদের অফিসে গেলে তিনি এ ব্যাপারে কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

গোয়ালদ উপজলা বিএনপি’র সিনিয়র সহ সভাপতি আইয়ুব আলী খান বলেন, ‘বিদ্যুত অফিস এখন আর চুরিতে সীমাবদ্ধ নাই। তারা এখন গ্রাহকদর উপর জুলুম ও  ডাকাতি করে যাছে। এরা মিটার না দেখে ইচ্ছা মত বিল করে, গ্রহকের কোন অভিযোগ গুরুত্ব দেয় না। তারা এ ভাবে করতে থাকলে বিদ্যুত বিভাগ ধ্বংস হয় যাবে।’

এ প্রসঙ্গে রাজবাড়ী জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি জ্যোতি শংকর ঝন্টু বলেন, ‘মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিদ্যুৎ একটি অপরিহার্য সেবা। অথচ বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমরা চাই, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিটি কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আসুক। সংযোগ প্রদান, বিল নির্ধারণ, মিটার ব্যবস্থাপনা, লোড অনুমোদন কিংবা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হয়রানি, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ বা ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না ঘটে। বিদ্যুতের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জনগণকে হয়রানি করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। আর মামলার ভয় দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহনের অভিযোগ খুবই দুঃখজনক।’ অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজবাড়ী‌তে বিভাগীয় কমিশনা‌রের স্কুল-হাসপাতালসহ বি‌ভিন্ন প্রতিষ্ঠান প‌রিদর্শন

প্রেমের বিয়ের চার মাস পর ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা

রাশিয়ায় বিস্ফোরণে নিখোঁজ থাকা ২ জনই পাংশার, খোঁজ মিলেছে ১ জনের

অনিয়ম, দুর্ণীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার আখড়া গোয়ালন্দের বিদ্যুত অফিস

রাজবাড়ী‌তে ইয়াবাসহ দুই নারী মেম্বর গ্রেফতার

দৌলতদিয়ায় ডুবোচরে ফেরি আটকা, সাংবাদিক দেখে ফেরির মাস্টার-সুকানির পলায়ন

রাজবাড়ীতে স্বামীর করা যৌতুক মামলায় স্ত্রী কারাগারে

রাজবাড়ীতে সাজাপ্রাপ্ত আসামীসহ ৫জন গ্রেপ্তার

পাংশায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি! 

রাজবাড়ী সেনা পাব‌লিক স্কুল এন্ড ক‌লে‌জের উদ্বোধন কর‌লেন সেনা প্রধান

১০

গোয়ালন্দে নৃশংস হত্যাকান্ডের ২৪ ঘণ্টায় রহস্য উদঘাটন, ভাইসহ গ্রেপ্তার ৩

১১

গোয়লন্দে দিন-দুপুরে নৃশংস খুন

১২

চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে নিহত বালিয়াকান্দির কনিকা মন্ডলের বাড়িতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

১৩

সিজারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই: ৫১ দিন পর প্রসূতির মৃত্যু

১৪

রাজবাড়ী‌তে সব‌জি রাখার মি‌নি কোল্ড স্টো‌রে‌জের উদ্বোধন

১৫

জলাবদ্ধতা নিরস‌নে সু‌বিধাব‌ঞ্চিত‌দের পা‌শে ছাত্রদল নেতা

১৬

স্বর্ণপদকজয়ী রাজবাড়ীর কৃতিসন্তান সাঁতারু রাফিকে সংবর্ধণা

১৭

রাজবাড়ী‌তে স্বেচ্ছা‌সেবকদ‌লের প্রতিষ্ঠাবা‌র্ষিকী পালন

১৮

পাংশায় নিখোঁজের একদিন পর দুই সন্তানের জননীর লাশ উদ্ধার

১৯

পাংশায় চুরির অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যা

২০